মন বসে না পড়ার টেবিলে, চলে যায় ফেসবুকে—বশ করার উপায় কী?
পড়ার টেবিলে বসেছেন। সামনে বই, পাশে খাতা, হাতে কলম। সবকিছু প্রস্তুত। শুধু প্রস্তুত নয় আপনার মন! বই খুলে প্রথম লাইনটি পড়েছেন। ঠিক তখনই মাথায় একটা চিন্তা এল, “একবার ফেসবুকটা দেখি। হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কোনো নোটিফিকেশন এসেছে।” ফেসবুক খুললেন। একটা পোস্ট দেখলেন। তারপর আরেকটা। তারপর একটা রিল। রিলের পর আরেকটা রিল। এভাবে কখন যে সময় চলে গেল, টেরই পেলেন না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সংবিধানের মৌলিক অধিকার পড়তে বসে আপনি কোনো এক অচেনা মানুষের রান্নার ভিডিও দেখছেন! আরও কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মনে হলো, “আচ্ছা, আমি এখানে এলাম কীভাবে?” এই দৃশ্য এখন অনেকের কাছেই পরিচিত।
বই খুললেই চোখে ঘুম আসে, অথচ ফেসবুক খুললে চোখে যেন 4K রেজ্যুলেশন চলে আসে! কিন্তু বিষয়টি শুধু হাসির নয়। মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার অভ্যাস ধীরে ধীরে পড়াশোনা, স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পড়াশোনায় মন না বসার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার, ঘন ঘন নোটিফিকেশন দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বদলে যাওয়া কনটেন্ট, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ, অতিরিক্ত চিন্তা কিংবা নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকা—সবকিছুই এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ড পরপর নতুন কিছু সামনে আসে। একটি পোস্ট, তারপর আরেকটি ভিডিও, তারপর নতুন কোনো ছবি বা খবর। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এমন দ্রুত পরিবর্তনশীল উদ্দীপনায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন একটি কঠিন অধ্যায় নিয়ে ৩০ মিনিট বসে থাকা অনেক বেশি কঠিন মনে হতে পারে। বিশেষ করে আইন, গণিত, বিজ্ঞান কিংবা কোনো দীর্ঘ ও মনোযোগসাপেক্ষ বিষয় পড়ার সময় এই সমস্যাটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। পড়ার টেবিলে তিন ঘণ্টা বসে থাকা আর তিন ঘণ্টা মন দিয়ে পড়া এক কথা নয়। আপনি হয়তো তিন ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসেছিলেন। কিন্তু প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর ফোন দেখেছেন, নোটিফিকেশন চেক করেছেন, কিছুক্ষণ অন্য চিন্তা করেছেন। ফলে সময় চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু শেখা হয়েছে খুব সামান্য। মনোযোগ বারবার ভেঙে গেলে একটি বিষয় বুঝতে বেশি সময় লাগে।
একই পৃষ্ঠা বারবার পড়তে হয়। কাজ জমতে থাকে। আর ধীরে ধীরে নিজের ওপর বিরক্তি তৈরি হয়। একসময় মনে হতে পারে, “আমার দ্বারা পড়াশোনা হবে না।” অথচ অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটা মেধার নয়। সমস্যাটা হলো মনোযোগ পরিচালনা করতে না পারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অপরাধবোধ। পড়ার সময় ফোন ব্যবহার করলেন, সময় নষ্ট হলো, নিজের ওপর রাগ হলো। সেই অস্বস্তি থেকে আবার ফোন হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ পর আরও সময় চলে গেল। তারপর আবার অপরাধবোধ। এভাবে একটা চক্র তৈরি হতে পারে। তাহলে এই চক্র থেকে বের হওয়ার উপায় কী? মনকে জোর করে আটকে রাখা নয়। বরং এমন একটা পরিবেশ ও অভ্যাস তৈরি করা দরকার যেখানে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়। এবার কয়েকটি কার্যকরী উপায় নিয়ে আলোচনা করা যাক।
প্রতিষ্ঠাতা, এডুকেশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানেট
১. আপনার সবচেয়ে বড় distraction যদি হাতের নাগালেই থাকে, তাহলে শুধু ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে লাভ নেই। পড়তে বসার সময় ফোন সাইলেন্ট করে অন্য ঘরে রেখে দিতে পারেন। সম্ভব হলে পরিবারের কারও কাছে দিতে পারেন। অন্তত চোখের সামনে না রাখাই ভালো। কারণ ফোন না দেখার জন্য নিজেকে বারবার বোঝানোর চেয়ে ফোন দেখার সুযোগটাই কমিয়ে দেওয়া সহজ।
২. মাত্র পাঁচ মিনিট ফেসবুক দেখব। এই পাঁচ মিনিটের সঙ্গে অনেকেরই বেশ পুরোনো সম্পর্ক আছে। পাঁচ মিনিট কখন ২০ মিনিট হয়, ২০ মিনিট কখন এক ঘণ্টা হয়, বোঝা কঠিন। তাই ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একেবারে বাদ দিতে হবে এমন নয়। বরং ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। যেমন দুপুরে ১৫ মিনিট এবং রাতে ১৫ মিনিট। বিনোদন খারাপ কিছু নয়। সমস্যা তখনই হয় যখন বিনোদনের সময়টা আপনার প্রয়োজনীয় সময়টুকু খেয়ে ফেলে।
৩. আজ ১০ ঘণ্টা পড়ব। শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এমন বিশাল লক্ষ্য অনেক সময় পড়া শুরু করার আগেই মাথায় চাপ তৈরি করে। তার বদলে বলুন, “এখন শুধু ২৫ মিনিট পড়ব।” পুরো বই শেষ করার চিন্তা না করে একটি ছোট অংশ শেষ করার লক্ষ্য নিন। একটি অধ্যায় নয়, কয়েকটি পৃষ্ঠা। কয়েকটি পৃষ্ঠা নয়, একটি নির্দিষ্ট বিষয়। শুরু করাটাই অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন কাজ। শুরু হয়ে গেলে গতি তৈরি হয়।
৪. ২৫ মিনিট মন দিয়ে পড়ুন। তারপর ৫ মিনিট বিরতি নিন। কয়েকটি সেশন শেষ হলে একটু বড় বিরতি নিতে পারেন। তবে একটা ব্যাপার মনে রাখবেন। পাঁচ মিনিটের বিরতি যেন ফেসবুকের পঞ্চাশ মিনিটের বিরতিতে পরিণত না হয়! শুরুতে ২৫ মিনিট কঠিন মনে হলে সেটাই করুন। পরে অভ্যাস তৈরি হলে ৩০, ৪৫ এমনকি ৫০ মিনিটের গভীর পড়ার সেশনেও যেতে পারবেন।
৫. বই পড়তে পড়তে ফোন দেখা, মেসেঞ্জারের উত্তর দেওয়া, গান পরিবর্তন করা, নোটিফিকেশন চেক করা—এসবকে আমরা অনেক সময় মাল্টিটাস্কিং বলি। আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা এক কাজ থেকে আরেক কাজে বারবার মন সরানো। তাই পড়ার সময় একটি কাজই করুন। একটি বই। একটি বিষয়। একটি লক্ষ্য।আপনার মস্তিষ্ককে বারবার নতুন কাজের দিকে ঘুরতে না দিলে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়।
৬. শুধু চোখ দিয়ে লাইন পড়তে থাকলে কিছুক্ষণ পর মন অন্যদিকে চলে যাওয়া স্বাভাবিক। তার বদলে পড়ার সময় নিজেকেই প্রশ্ন করুন—এই অংশের মূল বক্তব্য কী?
নিজের ভাষায় লিখুন। ছোট প্রশ্ন তৈরি করুন। বই বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করুন। এতে পড়াশোনা শুধু চোখ বুলানোর কাজ থাকে না। মস্তিষ্কও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে শুরু করে।
৭. পড়ার টেবিলে বসে যদি কখনো পড়েন, কখনো ফেসবুক দেখেন, কখনো সিনেমা দেখেন, আবার কখনো শুয়ে থাকেন, তাহলে মস্তিষ্কের কাছে ওই জায়গাটার নির্দিষ্ট কোনো পরিচয় তৈরি হয় না। সম্ভব হলে পড়ার জায়গাটা শুধু পড়াশোনার জন্য ব্যবহার করুন। একই জায়গায় নিয়মিত পড়তে বসলে ধীরে ধীরে একটা মানসিক অভ্যাস তৈরি হতে পারে। টেবিলে বসলেই মস্তিষ্ক বুঝতে শুরু করবে, এবার কাজের সময়।
৮. ক্লান্ত মস্তিষ্ক দিয়ে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। অনেকে মনে করেন রাতে কয়েক ঘণ্টা কম ঘুমিয়ে বেশি পড়লেই বেশি পড়াশোনা হবে। বাস্তবে ঘুম মনোযোগ ও স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমকে পড়াশোনার শত্রু না ভেবে পড়াশোনারই অংশ হিসেবে দেখুন। সতেজ মস্তিষ্কে এক ঘণ্টার কার্যকর পড়া অনেক সময় ক্লান্ত অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসে থাকার চেয়ে বেশি কাজে দেয়।
৯. আমাকে পড়তে হবে—এই কথাটা সবসময় যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কখনো নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “আমি আসলে কেন পড়ছি?” আপনি যে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যে পেশায় যেতে চান, যে জীবন তৈরি করতে চান—সেটার সঙ্গে আজকের এক ঘণ্টা পড়াশোনার সম্পর্কটা কী?
দূরের স্বপ্নকে প্রতিদিনের ছোট কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে পড়াশোনা আর শুধু একটা দায়িত্ব মনে হয় না। তখন মনে হয়, আজকের এই কয়েক ঘণ্টাই হয়তো আমাকে আমার কাঙ্ক্ষিত জীবনের একটু কাছে নিয়ে যাচ্ছে।
১০. এটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মনোযোগ নষ্ট হওয়া মানেই আপনি অলস বা ব্যর্থ—এমন নয়। মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়। লক্ষ্য হলো কখন মন সরে গেছে সেটা বুঝতে শেখা এবং আবার ফিরিয়ে আনা। পড়তে পড়তে হঠাৎ ফেসবুকের কথা মনে পড়ল? নিজেকে নিয়ে বিরক্ত হওয়ার দরকার নেই। নিজেকে শুধু বলুন, “মনটা একটু অন্যদিকে চলে গেছে। ঠিক আছে। এবার আবার পড়ায় ফিরি।” এই ফিরে আসার অভ্যাসটাই ধীরে ধীরে আপনার মনোযোগকে শক্তিশালী করবে।
শেষ কথা, জীবনের বড় সাফল্য অনেক সময় কোনো একটি বিশাল সিদ্ধান্ত থেকে আসে না। আসে ছোট ছোট সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা থেকে। আপনি যখন পড়ার টেবিলে বসে ফেসবুক না খুলে বইটা খুলছেন, তখন হয়তো পৃথিবীর কেউ আপনার এই সিদ্ধান্ত দেখছে না। কেউ হাততালি দিচ্ছে না। কেউ বলছে না, “বাহ, দারুণ করেছ!” কিন্তু আপনার ভবিষ্যৎ এই ছোট সিদ্ধান্তগুলোর ওপরই তৈরি হচ্ছে। ফেসবুক থাকবে। রিল থাকবে। নোটিফিকেশন থাকবে। বন্ধুদের পোস্ট থাকবে। নতুন নতুন ভিডিও আসতেই থাকবে।
কিন্তু আপনার সময় ফিরে আসবে না। তাই পরেরবার পড়তে বসে যখন মনে হবে, “একবার ফেসবুকটা দেখি”—তখন নিজেকেই একটা প্রশ্ন করুন, “আমি কি কয়েক মিনিটের বিনোদনের জন্য আমার কয়েক বছরের স্বপ্নকে অপেক্ষা করাচ্ছি?” হয়তো সেই একটি প্রশ্নই আপনাকে আবার বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনবে।