নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের যে উদ্ভাবন বদলে দিতে পারে কোটি কোটি স্নায়ুরোগীর জীবন
মানবমস্তিষ্কের জটিল কার্যপ্রণালি নিয়ে যুগান্তকারী উদ্ভাবন করে গেল সোমবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পেলেন তিন মার্কিন-জার্মান বিজ্ঞানী; কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগম্যান ও জর্জ ন্যাগেল। সমুদ্রের পানিতে জন্ম নেওয়া শ্যাওলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে করা এ গবেষণা সামনের দিনে অ্যালজেইমার রোগী থেকে শুরু করে অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্বসহ স্নায়ুরোগে আক্রান্ত অসংখ্য রোগীর জীবন আমুল বদলে দিতে পারে।
শৈবালে পাওয়া আলোকসংবেদনশীল প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে মানব মস্তিষ্কে প্রয়োগের উপযোগী অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তি তৈরি করেছেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট নিউরনকে আলো দিয়ে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হচ্ছে। মস্তিষ্কের রোগ, স্নায়ুতন্ত্র ও দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গবেষণায় এর গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অপটোজেনেটিকসের মূল ধারণাটি এসেছে শৈবালসহ বিভিন্ন অণুজীবে পাওয়া আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন নিয়ে গবেষণা থেকে। এসব প্রোটিনের মধ্যে চ্যানেলরোডোপসিন (Channelrhodopsin), যেটি নির্দিষ্ট ধরনের আলো পেলে কোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ বাড়াতে পারে। আবার হ্যালোরোডোপসিনের (Halorhodopsin) মতো কিছু প্রোটিন আলো ব্যবহার করে কোষের কার্যকলাপ কমাতে পারে।
সমুদ্রের শৈবালের কোষে আলো দিয়ে কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের এই পদ্ধতি যদি কাজ করে, তাহলে মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনেও একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব কি না বিজ্ঞানীদের এমন অনুমান থেকেই অপটোজেনেটিকসের বিকাশ। তবে মানুষের নিউরন স্বাভাবিকভাবে এসব আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করে না। তাই নির্দিষ্ট নিউরনে এসব প্রোটিন তৈরির জিন পৌঁছে দিতে গবেষকেরা ভাইরাল ভেক্টর ব্যবহার করেন। এর মধ্যে AAV বা অ্যাডিনো-অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাস একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এটি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোষে প্রয়োজনীয় জিন পৌঁছে দেওয়া যায়।
তারপর ওই কোষে আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি হলে বাইরে থেকে আলো প্রয়োগ করে কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। গবেষণায় নির্দিষ্ট নিউরনে আলো পৌঁছাতে সূক্ষ্ম অপটিক্যাল ফাইবারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত আলো সরবরাহের পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা চলছে।
অপটোজেনেটিকসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট ধরনের নিউরনকে লক্ষ্য করে তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে পারকিনসন, মৃগীরোগসহ বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের ক্ষেত্রে কোন নিউরন কীভাবে কাজ করছে, তা বোঝার পাশাপাশি সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের ওপর পরীক্ষামূলক গবেষণা হয়েছে। রেটিনার দৃষ্টিসংক্রান্ত কোষে আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহারের মাধ্যমে কিছু রোগীর দৃষ্টিশক্তি আংশিকভাবে উন্নত করার সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে এ ধরনের চিকিৎসা এখনো গবেষণা ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
সহজভাবে বললে, অপটোজেনেটিকস হলো জিনগত প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোষকে আলোর প্রতি সংবেদনশীল করে তোলা এবং পরে আলো ব্যবহার করে সেই কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা। অনেকটা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনের ‘সুইচ’ আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মতো।