১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৬

ক্লদ দিয়ে যুদ্ধ, গুপ্তচরবৃত্তি ও প্রতারণা—উঠে এলো ভয়ংকর তথ্য

ক্লদ   © টিডিসি ছবি

যুদ্ধের অস্ত্র তৈরি, কোটি মানুষের ওপর নজরদারি, ভুয়া সংবাদ ছড়ানো থেকে শুরু করে প্রেমের অভিনয়—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এমন ভয়ংকর অপব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে অ্যানথ্রপিকের নতুন প্রতিবেদনে। প্রতিষ্ঠানটির ১৫৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন অসাধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ক্লদকে ব্যবহার করে নজরদারি, প্রচারণা, অস্ত্র তৈরি ও প্রতারণার মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।

দ্রুত এগিয়ে চলা এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন এসব ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।

২ কোটি ৫০ লাখ সিম কার্ডে নজরদারি

মালির রাজধানী বামাকোতে কাজ করা এক প্রযুক্তি পরামর্শক দেশটির জান্তা-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এএনএসইর সঙ্গে কাজ করে ক্লদ কোড ব্যবহার করে ‘লাকানা ৩৬০’ নামে একটি নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করেন।

এই সিস্টেমটি দেশটির মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ সিম কার্ডের ওপর নজরদারি করতে সক্ষম। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তারা এই অ্যাপটি বন্ধ করতে পারেনি।

অ্যাপটি ফোনকল, খুদে বার্তা ও ভয়েস ট্রাফিক সংগ্রহ করতে পারে। কেউ সিম কার্ড পরিবর্তন করলেও তার কণ্ঠস্বর শনাক্ত করতে পারে এটি। এ ছাড়া কে এনক্রিপশন বা ভিপিএন ব্যবহার করছে, সেটিও শনাক্ত করতে পারে সিস্টেমটি।

আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিতে ক্লদ

রাশিয়ার একটি ছোট দল ক্লদ ব্যবহার করে এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করে, যা স্বয়ংক্রিয় ‘কামিকাজে’ ড্রোন পরিচালনায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

ড্রোনের এই বহরকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছিল, যাতে এটি নিজেই লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করে সেখানে গিয়ে আঘাত করে বিস্ফোরিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কোনো মানুষের প্রয়োজন ছিল না।

প্রোগ্রাম তৈরির সময় দলটি বারবার ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের একটি স্থানকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্বাচন করে। অ্যানথ্রপিকের ভৌগোলিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তারা ভিপিএনও ব্যবহার করে।

ওই ডেভেলপাররা দাবি করেছিল, তারা রাশিয়ার সরকারি ও সামরিক গবেষণা কর্মসূচি থেকে অর্থ পেয়েছে। তবে অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়নে এটি কোনো সরকারি সংস্থা নয়, বরং ছোট একটি ফ্রিল্যান্স ডেভেলপার দল ছিল।

ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহার

উত্তর ইয়েমেনের একটি গোষ্ঠী অস্ত্র তৈরিতে সহায়তার জন্য ক্লদ কোড ব্যবহার করেছে।

জনপ্রিয় এই কোডিং টুল ব্যবহার করে তারা একটি গাইডেড রকেটের সফটওয়্যার তৈরি, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা এবং আরও দ্রুতগতির এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে কাজ করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বলা হয় ‘হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল’।

ধরা পড়া এড়াতে তারা এআইয়ের সঙ্গে আলাদা আলাদা কথোপকথনে কাজগুলো ভাগ করে নেয়।

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ওই গোষ্ঠী কোনো কার্যকর অস্ত্র তৈরি করতে পেরেছিল কি না, তার প্রমাণ তারা পায়নি। তবে গোষ্ঠীটি একটি রকেট পরীক্ষামূলকভাবে ছুড়েছিল। সেটি সম্ভবত ব্যর্থ হয়। এরপর কী ভুল হয়েছিল, তা বের করতে তারা আবার এআইয়ের সহায়তা নেয়।

ভুয়া সংবাদ ছড়াতেও ক্লদ

ফ্রান্সের একটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান এলকেএম কোম্পানির সঙ্গে একটি ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর কার্যক্রমের যোগসূত্র পেয়েছে অ্যানথ্রপিক।

ক্লদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০টি ভাষায় প্রায় ৭০টি ভুয়া সংবাদ ওয়েবসাইটে রাজনৈতিক নিবন্ধ তৈরি ও প্রকাশ করে। এসব সাইটে অন্তত ৮ হাজার ৯১৩টি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিটি ওয়েবসাইটে কাল্পনিক সাংবাদিকের নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো। পাশাপাশি তৈরি করা হতো ভুয়া টুইটার বা এক্স অ্যাকাউন্ট। এসব অ্যাকাউন্টে শত শত ভুয়া ব্যবহারকারী মন্তব্য করত, যাতে সেগুলোকে বাস্তব মানুষের কর্মকাণ্ড বলে মনে হয়।

কারা অর্থ দিচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে এই কার্যক্রমের বার্তাও বদলে যেত। অ্যানথ্রপিক একে ‘সেবার বিনিময়ে প্রচারণা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এই কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ফ্রান্স। এ ছাড়া কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে (ডিআরসি) নিয়েও তারা ব্যাপক কাজ করেছে। দেশটির রুয়ান্ডার সঙ্গে চলমান সংঘাতে সাধারণত ডিআরসির পক্ষের অবস্থান তুলে ধরেছে তারা।

মুসলিম ব্রাদারহুড ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্যবস্তু

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাব বিস্তারকারী কার্যক্রম মুসলিম ব্রাদারহুড এবং আবুধাবির বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্যবস্তু বানায়।

ওই কার্যক্রমে ক্লদ ব্যবহার করে সুদান নিয়ে প্রতিবেদন, বিভিন্ন পক্ষের হয়ে প্রচারণামূলক উপকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ও সাক্ষ্য তৈরি করা হয়।

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, এই কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় এআই চরিত্রের নাম ছিল ‘ডেডশট’। তাকে এমন একটি নির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালিত করা হতো, যেখানে ‘বিশ্বজুড়ে মুসলিম ব্রাদারহুডকে বিলুপ্ত করার জন্য সমন্বিত আন্তঃআটলান্টিক ও আঞ্চলিক কার্যক্রম’ চালানোর কথা বলা হয়েছিল।

এ ছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬২তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য সরকারি সাক্ষ্যও এআই দিয়ে তৈরি করা হয়। এসব বক্তব্য তৈরির সময় ‘নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ’ মানা হয়, যার মধ্যে ছিল বক্তব্যে ইউএইর নাম উল্লেখ না করা।

ডেটিং অ্যাপেও ক্লদের ব্যবহার

চীনের একটি অ্যাপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ২০টির বেশি ডেটিং অ্যাপের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এসব অ্যাপে দাবি করা হতো, ব্যবহারকারীরা বাস্তব মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু গোপনে এসব অ্যাপ পরিচালনা করছিল ক্লদ।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র দুই সপ্তাহে অ্যানথ্রপিক ৪ হাজার ৭০০টির বেশি আলাদা ক্লদ-চালিত এআই চরিত্রের সন্ধান পায়। এসব চরিত্র অন্তত ২৫ হাজার বাস্তব ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলেছে।

সব মিলিয়ে তারা প্রায় ২৩ লাখ ৬০ হাজার বার্তা পাঠিয়েছে।

ব্যবহারকারীদের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে করাতে কিছু বাস্তব কর্মীকেও বটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। প্রতি তিনটি এআই চরিত্রের বিপরীতে প্রায় একজন করে মানুষ কাজ করত। এআই যেসব কাজ করতে পারত না, যেমন ভিডিও কল করা, সেগুলো সামলাতেন এসব মানবকর্মী।