এআইতে বৈশ্বিক জোট গড়ল চীন, কী এই ওয়াইকো?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন আন্তর্জাতিক জোট গঠন করেছে চীন। ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (ওয়াইকো) নামে এই আন্তঃসরকারি জোটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং এআই নীতিমালা প্রণয়নে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য নিয়েছে বেইজিং।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্সে (ওয়াইক) বক্তব্য দিতে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন কোনো একক দেশের একক প্রচেষ্টা হওয়া উচিত নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। এআই উন্নয়ন কোনো এক দেশের একক প্রদর্শনী নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি সিম্ফনি হওয়া উচিত।’
একই সঙ্গে তিনি এআই খাতে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করেন এবং কোনো একটি দেশের নিরাপত্তাকে অন্য দেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে না রাখার আহ্বান জানান।
কী এই ওয়াইকো?
গত ১৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (ওয়াইক)। যদিও গত বছর থেকেই বৈশ্বিক এআই জোট গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আসছিল চীন। সাংহাইভিত্তিক এই সংস্থার ঘোষিত লক্ষ্য হলো বিভিন্ন দেশের মধ্যে এআই-সংক্রান্ত সহযোগিতা জোরদার করা এবং এমন নীতিমালা তৈরি করা, যাতে প্রযুক্তিটি নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে এতে যোগ দিয়েছে ২৯টি দেশ। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো গ্লোবাল সাউথের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই জোটের মাধ্যমে জাতিসংঘে এআই-সংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে বেইজিং।
শি জিনপিং কী বলেছেন?
সম্মেলনে শি জিনপিং উন্মুক্ত (ওপেন সোর্স) এআই প্রযুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য চীন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে।’ ভবিষ্যতেও আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তিনি।
পাশাপাশি তিনি মানুষকেন্দ্রিক এআই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে বলেন, উপযুক্ত আইন, প্রযুক্তিগত নজরদারি, আগাম সতর্কতা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে এআইকে সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জোট?
চীনের শিল্পনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চিপ উৎপাদন থেকে শুরু করে এআইভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে দেশটি। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে।
অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টরে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও, বৃহৎ ডেটা সেন্টার পরিচালনার সক্ষমতা, বিরল খনিজ উৎপাদন এবং তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে চীনের উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। এসবই বড় আকারের এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি রপ্তানিতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব পদক্ষেপ জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। তবে বেইজিংয়ের অভিযোগ, এআই খাতে চীনের অগ্রযাত্রা থামাতেই এসব সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন : কীভাবে বুঝবেন আপনার ওয়াইফাই অন্য কেউ ব্যবহার করছে?
বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে নতুন অবস্থান
বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে এখনো অনেক দেশ হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে সামরিক খাতে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রেক্ষাপটে ওয়াইকোর নেতৃত্ব দিয়ে চীন বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং প্রথম ওয়াইকো গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তখন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, শুধু এআই প্রযুক্তি রপ্তানি নয়, বরং বৈশ্বিক এআই নীতি ও প্রতিষ্ঠান গঠনেও নেতৃত্ব দিতে চায় বেইজিং। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই এই জোটকে দেখছে চীন। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা।