এআই দিয়ে ছবির পোশাক মুছে তৈরি হচ্ছে ভিডিও, অ্যাপের ‘গেটওয়ে’ ইউটিউব–এক্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মানুষের পোশাক মুছে ফেলার মতো ভুয়া নগ্ন ছবি ও ভিডিও তৈরি করা ‘নুডিফাই’ অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে কোটি কোটি মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছে মূলধারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউটিউব ও এক্স এসব অ্যাপের জন্য কার্যত ‘গেটওয়ে’ বা প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।
গত সোমবার (১৩ জুলাই) ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ (আইএসডি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নন-কনসেনসুয়াল বা সম্মতি ছাড়া যৌনভাবে স্পষ্ট ডিপফেক তৈরি করতে ব্যবহৃত শীর্ষ ১০টি অ্যাপ ও ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে মানুষ কীভাবে এসব প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাচ্ছে, তা-ও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
‘নুডিফাই’ অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে এআই ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যেন তাকে পোশাকহীন দেখা যায়। এসব টুলকে ‘আনড্রেসিং’ বা ‘ডি-ক্লোদিং’ অ্যাপও বলা হয়।
আইএসডির গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নুডিফাই অ্যাপ ও ওয়েবসাইটগুলোতে ৫৭ লাখের বেশি ভিজিট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিজিট এসেছে ইউটিউব থেকে। প্ল্যাটফর্মটি এসব সাইটে ১৮ লাখের বেশি ভিজিট পাঠিয়েছে। মোট রেফারেল ট্রাফিকের ৩০ শতাংশেরও বেশি এসেছে ইউটিউব থেকে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ইউটিউবে ‘আনড্রেস অ্যাপ’ বা ‘নুডিফাই অ্যাপ’–এর মতো শব্দ লিখে সার্চ করলে এসব টুলের প্রচার ও পর্যালোচনামূলক ভিডিও পাওয়া গেছে। কিছু ভিডিওতে নির্দিষ্ট অ্যাপের ব্যবহার দেখানো হয়েছে। কোথাও আবার প্রচারমূলক কোড দিয়ে বিনা মূল্যে ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগের কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স থেকেও এসব সাইটে ১৩ লাখের বেশি ভিজিট গেছে। ফলে নুডিফাই অ্যাপের দিকে ব্যবহারকারীদের নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে উঠে এসেছে।
আইএসডি বলেছে, এসব তথ্য ইউটিউবের নিজস্ব নীতিমালার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ প্ল্যাটফর্মটির নীতিমালায় যৌনভাবে স্পষ্ট কনটেন্টের পাশাপাশি এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করা ওয়েবসাইটের লিংক বা বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, নুডিফাই টুলের প্রচার ও লিংক ইউটিউবে সহজেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
আইএসডির গবেষণা ও নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক মেলানি স্মিথ বলেন, ইউটিউব শুধু এসব সাইটে যাওয়ার একটি নিষ্ক্রিয় মাধ্যম ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মটি এসব টুল ব্যবহারে মানুষকে সহায়তাও করেছে।
গবেষণায় নুডিফাই অ্যাপগুলোর দাম ও সহজলভ্যতাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কোনো কোনো অ্যাপে মাত্র ১ ডলার খরচে একটি যৌনভাবে স্পষ্ট ছবি তৈরি করা যায়। কম খরচে এসব টুল ব্যবহার করা গেলেও ব্যবসা হিসেবে এগুলো অত্যন্ত লাভজনক। সম্প্রতি ওয়্যারডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব অ্যাপ ও ওয়েবসাইট সম্মিলিতভাবে বছরে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নুডিফাই অ্যাপের সাধারণ লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন বর্তমান বা সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকারা। তবে পরিবারের সদস্য, যেমন বোন ও চাচাতো বা মামাতো বোনদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: হোয়াটসঅ্যাপে প্রতারণা এড়াতে পারে এই ৫ নিরাপত্তা সেটিংস
আইএসডির গবেষণা ও নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক মেলানি স্মিথ বলেন, এসব টুল ব্যবহারের উদ্দেশ্য সব সময় যৌন প্রকৃতির নয়। অনেক ক্ষেত্রে কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করানো বা তার জীবিকা ও সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যেও এ ধরনের ছবি তৈরি করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নুডিফাই অ্যাপের অপব্যবহার নিয়ে এর আগেও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক্সের এআই চ্যাটবট গ্রক ব্যবহার করে নারীদের সম্মতি ছাড়া নগ্ন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি তৈরির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের মধ্যে কিছু অপ্রাপ্তবয়স্কের ছবিও ছিল।
তীব্র সমালোচনার মুখে এক্স জানিয়েছিল, তারা গ্রকের ব্যবহারে কিছু সীমাবদ্ধতা আনছে এবং অর্থের বিনিময়ে ব্যবহারকারীদের জন্য এর প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছিল, শিশু যৌন নিপীড়ন, সম্মতিবিহীন নগ্নতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন কনটেন্টের ক্ষেত্রে তাদের কোনো ছাড় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে সম্মতি ছাড়া কারও অন্তরঙ্গ ছবি ছড়িয়ে দেওয়া বেআইনি। দেশটির ‘টেক ইট ডাউন অ্যাক্ট’ মে মাসে পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো ভুক্তভোগী ছবি সরানোর অনুরোধ জানালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্মতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া ছবি সরাতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যেই ডিপফেকবিরোধী কোনো না কোনো আইন রয়েছে। গত মে মাসে মিনেসোটা প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে বিশেষভাবে নুডিফাই অ্যাপ নিষিদ্ধ করে। তবে আইন থাকা সত্ত্বেও এসব অ্যাপের বিস্তার কমেনি। বরং এগুলো আরও সহজলভ্য ও ব্যবহারবান্ধব হয়ে উঠছে।
আইএসডি তাদের প্রতিবেদনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, অফলাইন উদ্যোগ এবং নীতিগত পদক্ষেপ মিলিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচিতে অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক ওয়্যারড তদন্তে বিশ্বের ৯০টির বেশি স্কুলে ডিপফেক তৈরির ঘটনা শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ফলে নুডিফাই অ্যাপের বিস্তার দ্রুত থামার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্যসূত্র: ওয়াইয়ার্ড