বছরে গড়ে ৪০ দিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন বিশ্বের ৬৮ শতাংশ মানুষ
বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম প্রধান মাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ও প্রভাবকে স্বীকৃতি দিতে ৩০ জুন (মঙ্গলবার) ১৬তম বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া ডে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালে ডিজিটাল মিডিয়াভিত্তিক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ‘ম্যাশঅ্যাবল’ (Mashable) প্রথম এই দিবসটি পালনের সূচনা করে। দীর্ঘ ১৬ বছরের ব্যবধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কেবল সাধারণ চ্যাটিং বা আড্ডা দেওয়ার জায়গা নয়, বরং এটি বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
‘ডেটারিপোর্টাল ডিজিটাল ২০২৬ গ্লোবাল ওভারভিউ রিপোর্ট’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন প্রায় ৫৬৬ কোটিতে পৌঁছেছে, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশেরও বেশি। বিগত দুই দশকে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং সুলভ মূল্যের ইন্টারনেটের কারণে এই ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে; যেখানে ২০০৫ সালে ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ৫০ কোটির নিচে, ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৭ কোটিতে এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ সালে এসে তা ৫৬৬ কোটির মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, একজন সক্রিয় ব্যবহারকারী গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট (সপ্তাহে ১৮ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট) সময় কাটান সোশ্যাল মিডিয়ায়। এই হিসাবটি এক বছরের ফ্রেমে মেলালে দেখা যায়, মানুষ বছরে গড়ে ৪০টিরও বেশি পূর্ণ দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনে তাকিয়ে পার করে দিচ্ছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে পূর্ব এশিয়া (৮৮.১ শতাংশ)। এরপরেই রয়েছে উত্তর ইউরোপ (৭৯ শতাংশ), পশ্চিম ইউরোপ (৭৭.৭ শতাংশ) এবং উত্তর আমেরিকা (৭৪ শতাংশ)। অন্যদিকে, সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে মধ্য আফ্রিকা (১২.১ শতাংশ) এবং পূর্ব আফ্রিকা (১২.৬ শতাংশ)।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর তালিকায় এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে মেটা-মালিকানাধীন ‘ফেসবুক’ (৩.০৭ বিলিয়ন বা ৩০৭ কোটি মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী)। ফেসবুকের পরেই সমান ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ব্যবহারকারী নিয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেটারই অন্য দুটি প্ল্যাটফর্ম ‘ইনস্টাগ্রাম’ ও ‘হোয়াটসঅ্যাপ’। এরপরেই রয়েছে গুগলের ‘ইউটিউব’ (২৫৮ কোটি) এবং চীনের ‘টিকটক’ (১৯৯ কোটি)।
সোশ্যাল মিডিয়ার এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আসক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় বিশ্বের একাধিক দেশ ইতিমধ্যে অনূর্ধ্ব-১৬ বা ১৫ বছর বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা শুরু করেছে।
গত বছরের (২০২৫) ডিসেম্বরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কমপ্লিট বা পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে অস্ট্রেলিয়া। চলতি বছরের (২০২৬) মার্চ মাসে প্রথম এশীয় দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া অনূর্ধ্ব-১৬ শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে। একই মাসে ব্রাজিল একটি ডিজিটাল আইন পাস করে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য অভিভাবকের অ্যাকাউন্টের সাথে সংযোগ বাধ্যতামূলক করে এবং অ্যাপের ক্ষতিকর ‘ইনফিনিট স্ক্রোল’ ও ‘অটোপ্লে’র মতো ফিচারগুলো নিষিদ্ধ করে।
তাছাড়া গত এপ্রিল মাসে তুরস্ক একটি আইন পাস করে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। চলতি জুন মাসেই যুক্তরাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে যে, তারা ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ২০২৭ সালের বসন্তকাল থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টও ইউরোপজুড়ে ১৬ বছর ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ এবং অ্যাপের আসক্তি সৃষ্টিকারী ডিজাইনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব সমর্থন করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিবসের এই ১৬তম বার্ষিকীতে এসে বিশ্বজুড়ে এখন প্রযুক্তিগত উন্মাদনার চেয়ে বরং ব্যবহারকারীদের—বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সুরক্ষামূলক আইনি কাঠামোর দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।