সুপারকম্পিউটার তৈরিতে শীর্ষস্থান হারাল যুক্তরাষ্ট্র, জায়গা নিল এশিয়ার দেশ
বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির ও শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের নতুন বৈশ্বিক তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে শীর্ষ স্থান দখল করেছে চীন। জার্মানির হামবুর্গে ঘোষিত ২০২৩ সালের অর্ধবার্ষিক ‘টপ ৫০০’ তালিকায় এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে, যা কাটিং-এজ বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সাথে বেইজিংয়ের তীব্র প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে পুনর্ব্যক্ত করেছে।
নতুন তালিকা অনুযায়ী, চীনের শেনজেনে অবস্থিত ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টারে স্থাপিত ‘লাইনশাইন’ বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার সিস্টেম। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সুপারকম্পিউটার ‘এল ক্যাপিটান’-কে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান ছিনিয়ে নিল। ২০১৭ সালে চীনের ‘সানওয়ে তাইহুলাইট’ শীর্ষস্থান অর্জনের পর এই প্রথম কোনো চীনা সুপারকম্পিউটার বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে ফিরল।
লিপনাক বেঞ্চমার্ক প্রক্রিয়ায় ‘লাইনশাইন’ প্রতি সেকেন্ডে ২ কুইন্টিলিয়নেরও (১-এর পর ১৮টি শূন্য) বেশি হিসাব সম্পন্ন করে ২.১৯৮ এক্সাফ্লপস কর্মক্ষমতা অর্জন করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এল ক্যাপিটান’ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি গতিশীল।
টপ ৫০০ তালিকার অন্যতম সংগঠক এবং টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের এমেরিটাস অধ্যাপক জ্যাক ডনগ্যারা জানান, সবচেয়ে উন্নত চিপের ওপর মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই অর্জন দেখায় যে চীন উন্নত কম্পিউটিংয়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম। তিনি বলেন, ‘রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ হয়তো চীনের অত্যাধুনিক যন্ত্রাংশ পাওয়ার গতি ধিমে করেছে, কিন্তু এটি দেশটিকে নিজস্ব বিকল্প বা দেশীয় প্রযুক্তি গড়ে তুলতে শক্তিশালী অনুপ্রেরণা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই নিয়ন্ত্রণ চীনকে যেমন কিছুটা বাধাগ্রস্ত করবে, ঠিক তেমনি প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর হতে তাদের প্রচেষ্টাকে আরও ত্বরান্বিত করবে।’
অন্যান্য আধুনিক সুপারকম্পিউটার যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো চ্যাটবট পরিচালনার জন্য গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) ব্যবহার করে, সেখানে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমীভাবে ‘লাইনশাইন’ তৈরি হয়েছে কেবল জেনারেল-পারপাস সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (CPU) দিয়ে। সিপিইউ-ভিত্তিক নকশা ব্যবহার করে বিশ্বে ২ এক্সাফ্লপসের বেশি কর্মক্ষমতা অর্জন করা প্রথম ও একমাত্র সিস্টেম এই ‘লাইনশাইন’।
নতুন এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ‘ফ্রন্টিয়ার’ এবং চতুর্থ স্থানে আরগন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ‘অরোরা’। এ ছাড়া শীর্ষ ২০-এর মধ্যে জার্মানির ‘জুলিটার’ (পঞ্চম স্থান) ছাড়াও যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের সুপারকম্পিউটার স্থান পেয়েছে।
১৯৯৩ সাল থেকে বছরে দুইবার প্রকাশিত হওয়া এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকাটি মূলত সরকারি ও একাডেমিক উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তবে বর্তমান এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, মেটা বা অ্যালফাবেটের মতো করপোরেট জায়ান্টদের নিজস্ব কম্পিউটিং সিস্টেমের কারণে কেউ কেউ এই তালিকার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। উদাহরণস্বরূপ, ইলন মাস্কের এক্সএআই-এর মেমফিসের ‘কলোসাস’ সুপারকম্পিউটিং সুবিধার তুলনায় এল ক্যাপিটান মাত্র ২২ শতাংশ সক্ষমতা প্রদর্শন করে।
কম্পিউটিং শিল্প কনসালটেন্সি ‘ইন্টারসেক্ট৩৬০ রিসার্চ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডিসন স্নেল বলেন, ‘লাইনশাইন বিশ্বের শীর্ষ সুপারকম্পিউটার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। তবে এআই-এর আধিপত্য মানেই যে বিজ্ঞানের আধিপত্য—এমনটা ভাবা ভুল হবে। ভোক্তা পর্যায়ের চ্যাটবট বা ইমেজ জেনারেশন উচ্চ স্তরের কম্পিউটিংয়ের অংশ হলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য সুপারকম্পিউটারের প্রয়োজনীয়তা আলাদা। তাই প্রতিটি অঞ্চলেরই নিজস্ব ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করা উচিত।’