ডিজিটাল বিপ্লবের আড়ালে পানিসঙ্কট, এআই নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
সভ্যতার বিকাশের ধারায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে আলিঙ্গন করেছে মানুষ। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যত বেড়েছে, ততই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উদ্বেগও। একদিকে এআই যেমন কর্মদক্ষতা বাড়াচ্ছে এবং বৈশ্বিক উৎপাদনশীলতায় বড় ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে এর কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কাও করছেন অনেকে। ইতিমধ্যে বহু বহুজাতিক সংস্থা এআই-কে কাজে লাগিয়ে কর্মীসংখ্যা কমিয়েছে। কিন্তু প্রভাব শুধু চাকরির বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই—এআই এখন ঢুকে পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও গৃহস্থালির ভিতরেও। সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন সেই নিয়েই গভীর উদ্বেগের বার্তা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করছে। এমনকি প্রতিদিন এই অবকাঠামো “কিউসেক কিউসেক” পরিমাণ পানি ব্যবহার করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অচিরেই বিশ্বের পানীয় ও ব্যবহারযোগ্য পানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
জাপানে অবস্থিত ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি (ইউএনইউ)-এর গবেষকেরা এআই ডেটা সেন্টারের পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এআই ডেটা সেন্টারগুলোর পানি ও বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। এই ধারা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসব ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করবে, যা পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার সম্মিলিত বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার সমান। এই তিন দেশে মোট জনসংখ্যা ৬৫ কোটিরও বেশি।
পানির হিসাব আরও উদ্বেগজনক। গবেষকদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দশকের শেষে এআই যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করবে, তা প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের বার্ষিক ঘরোয়া পানির চাহিদার সমান হয়ে দাঁড়াবে।
এআই প্রযুক্তিতে এত পানি কেন লাগে—এ প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা গণমাধ্যমকে বলছেন, ‘যেকোনো উন্নত কম্পিউটিং ব্যবস্থার মতোই এআই অবকাঠামোও বিদ্যুৎনির্ভর। আর বিদ্যুৎ যত বেশি ব্যবহার হয়, তত বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শীতলীকরণ ব্যবস্থায় পানি ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে ওঠে।’
এ বিষয়ে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের (আইএসআই) অধ্যাপক শুভময় মৈত্র গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পানি ও বিদ্যুতের বিপুল ব্যবহার কম্পিউটেশনে নতুন নয়। আইবিএম-এর মতো সংস্থা যখন ষাট বা সত্তরের দশকে বৃহৎ কম্পিউটার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তখনও যন্ত্রকে ঠান্ডা রাখার জন্য পানি দরকার হত। তা না হলে যন্ত্রাংশ অতিরিক্ত উত্তাপে ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। আমার মতে, এআই-কে আলাদা করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক হবে না। সমস্যাটিকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।’
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে এতদিন মূলত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও বায়ুদূষণের দিকেই নজর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও পানিসম্পদ ও শক্তি ব্যবহারের মতো বড় সংকট থেকে গেছে আড়ালে। গবেষকদের মতে, সমস্যাটি বহুমাত্রিক—একটি দিক সামলাতে গেলে অন্য দিক আরও জটিল হয়ে পড়ছে। যেমন, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহারে কার্বন নির্গমন কমানো গেলেও পানি ও বিদ্যুৎ খরচ অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যেতে পারে। যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই পানির সংকট রয়েছে, সেখানে এটি আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণে প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে—এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তবে এআই-এর দৈনন্দিন ব্যবহারই সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে। মোট বিদ্যুৎ খরচের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই দৈনন্দিন ব্যবহারের কারণে হচ্ছে। একটি জনপ্রিয় এআই পরিষেবা প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি প্রম্পট গ্রহণ করে এবং সেগুলোর ভিত্তিতে কাজ সম্পন্ন করে। এতে বছরে কয়েকশত গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ হয়।
এছাড়া কাজের ধরনের ওপরও বিদ্যুৎ খরচ নির্ভর করে। সাধারণ লেখা তৈরি করতে যতটা বিদ্যুৎ লাগে, ছবি তৈরি করতে তার চেয়ে বেশি, আর ভিডিও তৈরিতে খরচ আরও অনেক বেশি।
জাতিসংঘের গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রবণতা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এআই খাতে বছরে প্রায় ২৫ লক্ষ টন বৈদ্যুতিন বর্জ্য উৎপন্ন হতে পারে। এই বর্জ্যের ভারও মূলত দরিদ্র দেশগুলোর ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন : করের ক্ষেত্রে যে আটটি পরিবর্তন আসছে
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এআই-ভিত্তিক কম্পিউটিং অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো এআই অবকাঠামো নেই। ফলে একদিকে যেমন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে পরিবেশগত বৈষম্যও। বহু দেশ এআই-এর সুফল পাচ্ছে না, অথচ এর পরিবেশগত ও সম্পদগত চাপ বহন করতে হচ্ছে তাদেরও।
জাতিসংঘের গবেষকেরা মনে করেন, এটি কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যেমন উৎপাদন ও প্রযুক্তি বাড়ে, তেমনি সমাজের একটি অংশকে এর মূল্যও দিতে হয়—কখনও কর্মসংস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে, কখনও সম্পদের বৈষম্যে, আবার কখনও পরিবেশগত ক্ষতির মাধ্যমে।
তাদের মতে, এআই-কে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা হিসেবে নয়, বরং পুঁজি, প্রযুক্তি, শক্তি ও সামাজিক বৈষম্যের বৃহত্তর সম্পর্কের মধ্যেই বিশ্লেষণ করতে হবে।
তবে জাতিসংঘের গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, তারা এআই-এর বিরোধী নন বরং এই প্রযুক্তি যেন বিশ্বজুড়ে আরও টেকসই হয়। এজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুসংগঠিত নীতি, পরিকল্পনা এবং শিল্প ও গবেষণা খাতের সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদেরও আরও সচেতন হতে হবে। তবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ হবে টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ।