২৭ মে ২০২৬, ০৯:৩৭

২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে মধ্যবিত্তের নাগালে থাকা ১০ মডেলের ফ্রিজ

কোলাজ ছবি   © টিডিসি সম্পাদিত

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের ইলেকট্রনিকস বাজারে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কোরবানির মাংস সংরক্ষণের প্রয়োজন এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ঈদ অফারকে ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশে ফ্রিজ বিক্রি এখন বেশ জমজমাট।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সহজ কিস্তি সুবিধা, মূল্যছাড়, ক্যাশব্যাক এবং ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের কারণে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী ক্রেতাদের মধ্যে ফ্রিজ কেনার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।

শোরুমগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় এখন চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ১০ থেকে ১৪ সিএফটি ধারণক্ষমতার মাঝারি আকারের ফ্রিজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পরিবার সদস্য সংখ্যা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের বিষয় মাথায় রেখে ক্রেতারা ফ্রিজ নির্বাচন করছেন।

বাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফ্রিজ পাওয়া যাচ্ছে। ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী দাম ২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ইনভার্টার প্রযুক্তির মাঝারি ফ্রিজই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে।

ডিজিটাল ক্যাম্পেইন ও কিস্তি সুবিধায় ক্রেতা আকর্ষণ

ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ১০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়, ক্যাশব্যাক, ফ্রি হোম ডেলিভারি এবং পুরোনো ফ্রিজ বদলে নতুন ফ্রিজ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

এদিকে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে কিস্তি সুবিধা। ৬ মাস থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত ইএমআই সুবিধা থাকায় ডাউনপেমেন্ট ছাড়াই ফ্রিজ কেনার সুযোগ পাচ্ছেন অনেক ক্রেতা। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে কেনাকাটার চাপ বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরে মোট ফ্রিজ বিক্রির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হয় কোরবানির ঈদের আগে এক মাসেই।

মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে ১০ ফ্রিজ

বাংলাদেশে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে রেফ্রিজারেটরের বাজার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইনভার্টার প্রযুক্তি, নো-ফ্রস্ট সুবিধা, বেশি স্টোরেজ এবং ভালো সার্ভিস—এসব বিষয় ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। নিচে এই দামের মধ্যে পাওয়া যায় এমন ১০টি জনপ্রিয় ফ্রিজের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো।

১. সিঙ্গার ১৫৭ লিটার SRREF-SS300-FTDS155-RG: প্রায় ২২,০০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ১৫৭ লিটার (গ্রস)
ধরন: ডাইরেক্ট কুল, টপ মাউন্ট
কমপ্রেসর: কনভেনশনাল
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
ওয়ারেন্টি: ১ বছর (কমপ্রেসর ৫ বছর)

সিঙ্গারের এই এন্ট্রি-লেভেল মডেলটি মূলত ছাত্রাবাস, ছোট স্টুডিও ফ্ল্যাট বা এক থেকে দুই সদস্যের পরিবারের জন্য তৈরি। টপ-মাউন্ট ফ্রিজার থাকায় এটি কম জায়গায় ব্যবহারযোগ্য। তবে এতে ইনভার্টার প্রযুক্তি বা অটো ডিফ্রস্ট নেই, যা এই দামের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না।

অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গ্যাসকেট ও গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ফিল্টার থাকায় এটি বাংলাদেশের আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য কিছুটা বাড়তি সুবিধা দেয়। বাজেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলে এবং পরিবার ছোট হলে এটি শুরু করার মতো একটি অপশন।

২. ওয়ালটন WFD-1F3-GDEL-SC ১৭৬ লিটার ডাইরেক্ট কুল ইনভার্টার: প্রায় ২৭,০০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ১৭৬ লিটার (গ্রস)
ধরন: ডাইরেক্ট কুল, সিঙ্গেল ডোর
কমপ্রেসর: BLDC ইনভার্টার
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ১০ বছর কমপ্রেসর

কম বাজেটে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ইনভার্টার ফ্রিজ চাইলে এটি একটি শক্তিশালী পছন্দ। BLDC (ব্রাশলেস DC) ইনভার্টার কমপ্রেসর লোড অনুযায়ী গতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভোল্টেজ ওঠানামা ভালোভাবে সামলে নেয়।

এটি আইপিএস ব্যাকআপেও ভালো কাজ করে, যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। ১০ বছরের কমপ্রেসর ওয়ারেন্টি এই দামে একটি বড় প্লাস পয়েন্ট। ছোট পরিবার বা দম্পতির জন্য এটি উপযুক্ত।

৩. সিঙ্গার ২০০ লিটার SRREF-SS300-FTDS200: প্রায় ২৮,০০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২০০ লিটার (গ্রস)
ধরন: ডাইরেক্ট কুল, টপ মাউন্ট
কমপ্রেসর: কনভেনশনাল, লো-ভোল্টেজ
ওয়ারেন্টি: ১ বছর (কমপ্রেসর ৫ বছর)

সিঙ্গারের এই ২০০ লিটারের মডেলটি আগের ১৫৭ লিটারের তুলনায় বেশি জায়গা দেয়। একই সাথে এতে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গ্যাসকেট ও গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ফিল্টার রয়েছে।

এর বড় সুবিধা হলো লো-ভোল্টেজ কমপ্রেসর, যা প্রায় ১৪০ ভোল্ট পর্যন্ত কম ভোল্টেজেও কাজ করতে পারে। এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ও জেলা পর্যায়ের বিদ্যুৎ সমস্যার জন্য খুবই কার্যকর।

৪. ওয়ালটন WFA-2A3-GDEL-SC ২১৩ লিটার ডাইরেক্ট কুল: ৩৩,০০০–৩৫,০০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২১৩ লিটার (গ্রস) / ১৭৬ লিটার (নেট)
ধরন: ডাইরেক্ট কুল, সিঙ্গেল ডোর
কমপ্রেসর: RSCR (কনভেনশনাল)
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ৩ বছর কমপ্রেসর

এটি ওয়ালটনের অন্যতম জনপ্রিয় মধ্যম মানের সিঙ্গেল-ডোর মডেল। ২১৩ লিটার ধারণক্ষমতা থাকায় তিন থেকে চার সদস্যের পরিবারের জন্য এটি যথেষ্ট উপযোগী।

গ্লাস শেলফ ও অ্যাডজাস্টেবল ইন্টারনাল ডিজাইন খাবার সংরক্ষণকে সহজ করে। আগের মডেলের তুলনায় এর লুকও আধুনিক। তবে এটি ইনভার্টার নয়, তাই বিদ্যুৎ খরচ কিছুটা বেশি হতে পারে।

তবে ওয়ালটনের ৬৪ জেলায় বিস্তৃত সার্ভিস নেটওয়ার্ক থাকায় সার্ভিসিং পাওয়া তুলনামূলক সহজ।

৫. স্যামসাং RB21 ২১৮ লিটার নো-ফ্রস্ট বটম মাউন্ট: ৩৫,৯০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২১৮ লিটার (গ্রস)
ধরন: নো-ফ্রস্ট, বটম মাউন্ট ফ্রিজার
কমপ্রেসর: ডিজিটাল ইনভার্টার
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ১০ বছর কমপ্রেসর

স্যামসাংয়ের এই মডেলটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বটম-মাউন্ট ডিজাইন। এতে ফ্রিজার নিচে থাকে এবং প্রতিদিনের ব্যবহারযোগ্য খাবার চোখের সামনে রাখা যায়, ফলে বারবার নিচু হতে হয় না।

নো-ফ্রস্ট প্রযুক্তির কারণে বরফ জমে না এবং আলাদা ডিফ্রস্ট করার প্রয়োজন হয় না। ডিজিটাল ইনভার্টার কমপ্রেসর বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে এবং দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল পারফরম্যান্স দেয়।

তবে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—এ ধরনের নো-ফ্রস্ট মডেলের জন্য সাধারণ IPS সবসময় উপযুক্ত নাও হতে পারে, বিশেষ করে নিম্নমানের মডিফায়েড সাইন ওয়েভ IPS ব্যবহৃত হলে।

৬. ওয়ালটন WFB-2E0-GDEL-XX ২৫০ লিটার ডাইরেক্ট কুল BLDC ইনভার্টার: ৩৫,০০০–৩৮,০০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২৫০ লিটার (গ্রস)
ধরন: ডাইরেক্ট কুল
কমপ্রেসর: BLDC ইনভার্টার
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ১০ বছর কমপ্রেসর

চার সদস্যের পরিবারের জন্য এটি একটি ব্যালান্সড অপশন। বড় স্টোরেজ থাকায় এক সপ্তাহের বাজার সহজেই রাখা যায়।

BLDC ইনভার্টার কমপ্রেসর বিদ্যুৎ খরচ কমায় এবং আইপিএস ব্যাকআপেও ভালোভাবে চলে। তবে এটি ডাইরেক্ট কুল হওয়ায় সময় সময় ম্যানুয়ালি ডিফ্রস্ট করতে হয়।

৭. ওয়ালটন WFB-2E4-GAXB-WD ২৬৮ লিটার ইনভার্টার উইথ ওয়াটার ডিসপেনসার: ৪০,০০০–৪৩,০০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২৬৮ লিটার (গ্রস)
ধরন: ডাইরেক্ট কুল, ওয়াটার ডিসপেনসার
কমপ্রেসর: BLDC ইনভার্টার
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
অতিরিক্ত: টেম্পারড গ্লাস ডোর, ওয়াটার ডিসপেনসার
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ১০ বছর কমপ্রেসর

এই মডেলের অন্যতম আকর্ষণ হলো দরজা না খুলেই ঠান্ডা পানি নেওয়ার সুবিধা। এতে ভেতরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং বিদ্যুৎ খরচ কম হয়।

টেম্পারড গ্লাস ডোর এটিকে প্রিমিয়াম লুক দিয়েছে। ২৬৮ লিটার ক্ষমতা থাকায় এটি চার থেকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের জন্য উপযোগী।

৮. হায়ার HRF-270WMBG ২৪৯ লিটার ৫-ইন-১ কনভার্টেবল নো-ফ্রস্ট: ৪২,০০০–৪৬,৫০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২৪৯ লিটার
ধরন: নো-ফ্রস্ট, কনভার্টেবল
কমপ্রেসর: ইনভার্টার
মোড: ৫-ইন-১ কনভার্টেবল (ফ্রিজ, ফ্রিজার, চিলার, সফট-ফ্রিজ, ভ্যাকেশন মোড)
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ১০ বছর কমপ্রেসর

এই মডেলটি ফিচার সমৃদ্ধ। প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্রিজকে বিভিন্ন মোডে ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে মাছ-মাংস সংরক্ষণের জন্য সফট-ফ্রিজ ও ফ্রিজার মোড খুবই কার্যকর।

ভ্যাকেশন মোডে বাইরে গেলে কম বিদ্যুৎ খরচে চালানো যায়। বড় শহরে এর সার্ভিস ভালো হলেও জেলা পর্যায়ে ওয়ালটনের সার্ভিস এখনো বেশি নির্ভরযোগ্য।

৯. ওয়ালটন WFE-2H2-GDEN-DD ২৮২ লিটার ডাইরেক্ট কুল ইনভার্টার: ৪৪,০০০–৪৮,০০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২৮২ লিটার (গ্রস)
ধরন: ডাইরেক্ট কুল
কমপ্রেসর: BLDC ইনভার্টার
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ১০ বছর কমপ্রেসর

ওয়ালটনের ডাইরেক্ট কুল ইনভার্টার সিরিজের বড় ক্যাপাসিটি মডেলগুলোর একটি এটি। বড় পরিবারের জন্য এটি পর্যাপ্ত স্টোরেজ দেয়।

ইনভার্টার প্রযুক্তি বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করে এবং আইপিএস সাপোর্টে ভালো পারফর্ম করে। তবে অন্যান্য ডাইরেক্ট কুল মডেলের মতো এটিতেও নিয়মিত ডিফ্রস্ট করতে হয়।

১০. স্যামসাং RT29 ২৭৫ লিটার ডিজিটাল ইনভার্টার নন-ফ্রস্ট: ৪৯,৯০০ টাকা

ক্যাপাসিটি: ২৭৫ লিটার (গ্রস)
ধরন: নন-ফ্রস্ট (ফ্রস্ট-ফ্রি)
কমপ্রেসর: ডিজিটাল ইনভার্টার
রেফ্রিজারেন্ট: R600a
নয়েজ: ৩৮ ডেসিবেল
ওয়ারেন্টি: ১ বছর সাধারণ, ১০ বছর কমপ্রেসর

এই তালিকার সবচেয়ে প্রিমিয়াম মডেল এটি। নো-ফ্রস্ট প্রযুক্তির কারণে আলাদা ডিফ্রস্ট করার প্রয়োজন হয় না এবং বিদ্যুৎ খরচও কম থাকে।

স্যামসাংয়ের ডিজিটাল ইনভার্টার প্রযুক্তি সাধারণ কমপ্রেসরের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে বলে দাবি করা হয়। চার থেকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের জন্য এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, কম রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন এমন ভালো অপশন।

নোটঃ বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দাম হালকা কম বেশি হতে পারে।