বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ কেন ডানহাত ব্যবহার করেন, যা বলছেন বিজ্ঞানীরা
বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই যেকোনো কাজে ডান হাত ব্যবহার করতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, যার নেপথ্যে বিবর্তন, মস্তিষ্কের গঠন এবং বংশগতি বা জিনের এক জটিল সংযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের এই ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা কেবল আধুনিক যুগে নয়, বরং হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের উৎপত্তিরও আগে, প্রায় ২৬ লক্ষ বছর আগেকার আদিম হোমিনিনদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল।
আমেরিকার রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী স্কট ট্রেভার্সের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যেও কোনো একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ বেছে নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও মানুষের মতো ৯০ শতাংশের একচেটিয়া আধিপত্য আর কোনো প্রজাতির মধ্যে দেখা যায় না।
বিজ্ঞানীরা আদিম মানুষের ব্যবহৃত পাথরের প্রাচীন হাতিয়ার এবং নিয়ানডার্থালদের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, তাদের দাঁতের দাগ ও কাজের ধরন ছিল স্পষ্টত ডানহাতিদের মতো। এমনকি নিয়ানডার্থাল শিশুদের দাঁতেও একই ধরনের চিহ্ন মেলায় গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই প্রবণতা কোনো বয়স বাড়ার পর তৈরি হয় না, বরং এটি জন্মগত।
বিবর্তনের ধারায় সূক্ষ্ম ও জটিল কাজের জন্য মস্তিষ্ক একটি প্রধান হাতকে বেছে নেয় এবং মানুষের ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে ডান হাতই জয়ী হয়ে এসেছে। মূলত শারীরিক ও স্নায়বিক গঠনের কারণেই বাম হাতের পরিবর্তে ডান হাত এগিয়ে দেওয়ার এই সার্বজনীন প্রবণতা মানুষের মধ্যে স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
ডানহাতি প্রবণতা প্রাচীন এবং সর্বজনীন— এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরেও যে প্রশ্নটি থেকে যায়, তা হল কেন? কেন ডান এবং কেন বাম নয়? এ বিষয়ে চারটি সম্ভাবনার কথা অনুমান করেছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের একাংশ বিবর্তনের সঙ্গে ডানহাতি প্রবণতার সম্পর্ক চিহ্নিত করেন। তাদের দাবি, যে কোনও সূক্ষ্ম কাজের ক্ষেত্রে প্রধান হাতটিই ব্যবহৃত হয়। অন্য হাতটি তাতে সহায়তা করে মাত্র। বিবর্তনের সূত্রগুলি প্রকৃতিতে সেই সমস্ত প্রাণীদেরই সুবিধা করে দিয়েছে, যাদের শারীরিক ও স্নায়বিক গঠন এই ধরনের কাজের সহায়ক। মানুষের ক্ষেত্রেও লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তাই ডান হাত জয়ী হয়ে এসেছে।
অনেকেই আবার মানুষের শারীরিক গঠনের সঙ্গে ডান হাতে কাজের প্রবণতাকে জুড়ে থাকেন। তাদের ব্যাখ্যা, মানুষের কথা বলা এবং ভাষার নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধে থাকে। এই অংশই শরীরের ডান দিকটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাকশক্তি এবং অঙ্গভঙ্গির উদ্ভব বাম গোলার্ধের প্রাধান্য এবং ডানহাতি প্রবণতাকে তাই আরও শক্তিশালী করেছে। সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাম গোলার্ধই মস্তিষ্কের প্রধান নির্বাহী হয়ে উঠেছে। ডান হাত তাকে অনুসরণ করে থাকে।
বাম ও ডানের মধ্যকার এক শ্রেণির মানুষ আছেন যারা উভয়হাত সমানভাবে ব্যবহার করতে পারেন। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ০.১ শতাংশের মধ্যে এই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিজ্ঞানীরা জানান, এদের মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধই সমান ভাবে সক্রিয়। শারীরিক নিয়ন্ত্রণে কারও একক আধিপত্য থাকে না। এতে মনঃসংযোগের সমস্যা হয় বলেও গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।