২৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪০

এআইয়ের দাপটেও টিকে থাকবে যে ২২ চাকরি

প্রতীকী ছবি   © টিডিসি ফটো/এআই

বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতি শুধু কাজের ধরনই বদলে দিচ্ছে না, বরং মানুষের কর্মসংস্থান নিয়েও তৈরি করছে নতুন অনিশ্চয়তা। তথ্য বিশ্লেষণ, কাস্টমার সার্ভিস থেকে শুরু করে সৃজনশীল কাজ সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি চাকরির বাজারে এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে। একাধিক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে দ্রুত। প্রায় ৫২ শতাংশ কর্মী মনে করছেন, এআই তাদের কাজের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ আশঙ্কা করছেন খুব শিগগিরই এআই তাদের কর্মক্ষেত্রে জায়গা দখল করে নিতে পারে।

গবেষণার পেছনের প্রেক্ষাপট
এই বাস্তবতায় মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা এনথ্রোপিক তাদের উন্নত এআই মডেল ক্লাউড ব্যবহার করে একটি বিশদ বিশ্লেষণ চালায়। উদ্দেশ্য ছিল কোন পেশাগুলি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এবং কোনগুলি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এআই তাত্ত্বিকভাবে অনেক কাজ করতে সক্ষম হলেও বাস্তব ব্যবহারে এখনও একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কম্পিউটার ও গণিতভিত্তিক কাজের প্রায় ৯৪ শতাংশ এআই করতে পারলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ মাত্র ৩৩ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, সক্ষমতা আর বাস্তব প্রয়োগ এই দুইয়ের মধ্যে এখনও স্পষ্ট ফারাক রয়েছে।

কেন সব কাজ এআই নিতে পারছে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব কাজে মানবিক বোধ, আবেগ, সৃজনশীলতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত বা বাস্তব পরিবেশে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন সেসব ক্ষেত্রেই এআই এখনো সীমাবদ্ধ। এআই দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণে দক্ষ হলেও মানুষের মতো অনুভব করা, সম্পর্ক বোঝা বা জটিল বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি।

এআই যুগে যেসব পেশা তুলনামূলক নিরাপদ

গবেষণায় ২২টি পেশাকে তুলনামূলকভাবে ‘এআই-প্রতিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

১. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাত: এর মধ্যে চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসক, নার্স, দন্তচিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। কেননা চিকিৎসায় শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন মানবিক স্পর্শ, সহানুভূতি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত।

২. শিক্ষা ও সমাজসেবা: শিক্ষক (বিশেষ করে শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষক), সমাজকর্মী ও কাউন্সেলর। এখানে মানুষের মানসিক বিকাশ, আচরণগত পরিবর্তন ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য।

৩. আইন ও প্রশাসন: বিচারক ও আইনজীবী। এই পেশায় আইনের ব্যাখ্যা, নৈতিক বিচার ও প্রেক্ষিতভিত্তিক সিদ্ধান্ত এসব এখনো পুরোপুরি যান্ত্রিক করা সম্ভব নয়।

৪. সৃজনশীল পেশা: এখানে, লেখক, শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, চিত্রগ্রাহক অন্যতম। কারণ-মৌলিকতা, কল্পনাশক্তি ও মানবিক অভিজ্ঞতা এই তিনটি উপাদান এখনো মানুষের একচ্ছত্র শক্তি।

৫. কারিগরি ও দক্ষ শ্রম: কারিগরি ও দক্ষ শ্রমিকের চাকরি কাড়তে পারবে না এআই। বৈদ্যুতিক কর্মী, কলের মিস্ত্রি, নির্মাণ ব্যবস্থাপক, গাড়ি সারাই কর্মীদের চাকরি কাড়তে পারবে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই ধরনের কাজে হাতেকলমে দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। কৃত্রিম মেধার সাহায্যে কাজের সেই শর্তপূরণ করা সম্ভবপর না-ও হতে পারে। তাই এই পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষদের এখনই কোনও শঙ্কার কারণ নেই।

৬. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পেশা: কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানী, রাঁধুনি, বিমানচালক। জরুরি সেবা কর্মী ও  ব্যক্তিগত সহকারী এসব পেশায় বাস্তব পরিস্থিতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোথায় বাড়বে এআইয়ের প্রভাব?
তবে সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা নেই। গবেষণায় বলা হয়েছে, হিসাবরক্ষণ, আর্থিক বিশ্লেষণ, কিছু প্রযুক্তিনির্ভর কাজ এবং ডেটা-ভিত্তিক পেশাগুলিতে এআইয়ের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা কমে গিয়ে সহায়ক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ হতে পারে।

ভবিষ্যতের কর্মবাজার: কী বার্তা?

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দশকে কর্মক্ষেত্র হবে ‘মানুষ ও এআই’-এর যৌথ মডেল। এআই পুরোপুরি চাকরি কেড়ে নেবে এমন ধারণা অতিরঞ্জিত হলেও, কাজের ধরন বদলে যাবে নিশ্চিতভাবেই। বিশেষ করে মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, যেসব পেশায় এআইয়ের ব্যবহার বেশি, সেসব ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর হতে পারে।

গবেষণা অনুসারে, অনেক পেশায় এমন সব কাজ জড়িত থাকে যে সমস্ত কাজের জন্য শারীরিক পরিশ্রম, বাস্তব জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বা দায়িত্বের প্রয়োজন হয়। সেই কাজ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের পক্ষে সহজে সামলানো সম্ভব নয়। কৃষিকাজের মধ্যে গাছ ছাঁটাই বা খামারের যন্ত্রপাতি চালানোর মতো কাজগুলি এআই সিস্টেমগুলো করতে পারে না। আবার আদালতে মক্কেলদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো আইনি কাজও বর্তমান এআই মডেল বা সিস্টেমের আওতার বাইরে রয়ে গিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এআই এখনও তার কাজের সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। তবে, ভবিষ্যতে এআই-এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে এমন চাকরিগুলিতে কর্মজীবনের অগ্রগতি মন্থর হয়ে যেতে পারে। মার্কিন সরকারি সংস্থা ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের অনুমান অনুযায়ী, ২০৩৪ সাল পর্যন্ত এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার থাকবে এমন চাকরিগুলিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার সামান্য কমে যেতে পারে। [সূত্র: আনন্দবাজার]