১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করছে ইন্দোনেশিয়া
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দেশটির যোগাযোগ ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী মুত্যা হাফিদ এ ঘোষণা দেন।
গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সরকার নতুন একটি বিধিমালায় স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আর কোনো অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউটিউব, টিকটক, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস, এক্স, রোবলক্স এবং লাইভস্ট্রিমিং সাইট বিগো লাইভ।’
প্রায় ২৮৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবেও বিবেচিত।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৮ মার্চ থেকে ধাপে ধাপে এই বিধিমালার বাস্তবায়ন শুরু হবে এবং সব প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুসরণ না করা পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলবে।
মন্ত্রী মুত্যা হাফিদ বলেন, ‘এর ভিত্তি খুবই স্পষ্ট। আমাদের শিশুরা ক্রমেই বাস্তব হুমকির মুখে পড়ছে। তারা পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে আসছে, সাইবার হয়রানির শিকার হচ্ছে, অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকিতে পড়ছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সরকার এখানে আছে যাতে অভিভাবকদের আর অ্যালগরিদমের বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে একা লড়াই করতে না হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের ভবিষ্যতের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ডিজিটাল জরুরি পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।’
তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘এই বিধিমালা বাস্তবায়নের শুরুতে কিছু অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, ‘শিশুরা হয়তো অভিযোগ করবে এবং অভিভাবকেরা সেই অভিযোগের জবাব কীভাবে দেবেন তা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত হতে পারেন।’
রাজধানী জাকার্তার অনেক বাসিন্দা ও অভিভাবক সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিশুরা অনেক সময় পর্যবেক্ষণ ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে।
জাকার্তার ৪৩ বছর বয়সী বাসিন্দা মারিয়ানা বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এটি খুবই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল। কারণ তারা ছবি, ভিডিওসহ নানা বিষয় ব্যবহারে অতিরিক্ত স্বাধীনতা পাচ্ছে। কিছু বিষয় শিক্ষামূলক হলেও অনেক কিছু বিভ্রান্তিকর। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নতুন করে বাছাই করা প্রয়োজন।’
আবার কেউ কেউ মনে করেন, সরকারকে পর্নোগ্রাফি ও অনলাইন জুয়ার মতো ক্ষতিকর ওয়েবসাইটও বন্ধ করা উচিত। জাকার্তার ৪৯ বছর বয়সী বাসিন্দা হারিয়ানতো বলেন, ‘অভিভাবক হিসেবে আমরা আশা করি অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফির ওয়েবসাইটও সরিয়ে দেওয়া হবে। মানুষের স্বার্থে, শিশুদের স্বার্থে এবং তাদের বেড়ে ওঠার স্বার্থে সরকারকে এ বিষয়ে ন্যায্য পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এ সপ্তাহের শুরুতে ক্ষতিকর কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগের কারণে যোগাযোগ ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জাকার্তা কার্যালয়ে আকস্মিক পরিদর্শন চালায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট ব্যবস্থাপনায় জাতীয় বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কঠোর সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে বলে জানায় মন্ত্রণালয়।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা প্রথম দেশ হবে ইন্দোনেশিয়া।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়াতে কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। সেখানে শিশুদের হিসেবে শনাক্ত হওয়া প্রায় ৪৭ লাখ অ্যাকাউন্ট বাতিল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো।
এ ছাড়া স্পেন, ফ্রান্স, এবং যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশেও শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বা তা বিবেচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—এমন উদ্বেগ থেকেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।