ফোনের মেমোরি দ্রুত শেষ হচ্ছে, ৭ উপায়ে সমাধান!
ফোনে জরুরি একটি ছবি তুলতে গেলেন, হঠাৎ স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘স্টোরেজ স্পেস শেষ’। নতুন কোনো অ্যাপ ইনস্টলেও একই বার্তা। অথচ কিছুদিন আগেও ফোনে পর্যাপ্ত জায়গা ছিল। জায়গা খালি করতে গিয়ে মুছতে হচ্ছে পুরোনো ছবি কিংবা পছন্দের ভিডিও। বুঝে ওঠাও কঠিন, ঠিক কোন ফাইলগুলো ফোনের এত জায়গা দখল করে রেখেছে।
স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের কাছে এটি এখন পরিচিত সমস্যা। প্রতিদিন ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনলাইন ভিডিও দেখা কিংবা বিভিন্ন অ্যাপ ডাউনলোডের কারণে ফোনে জমতে থাকে অসংখ্য ফাইল। এর সঙ্গে অ্যাপের অস্থায়ী তথ্য, ক্যাশ ফাইল, ডাউনলোড করা কনটেন্ট এবং অপারেটিং সিস্টেমের আপডেট তো রয়েছেই। ফলে ১২৮ জিবি স্টোরেজের ফোনও অনেক সময় দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়।
মেমোরি কীভাবে পূর্ণ হয়? কোন কোন অ্যাপ বা ফাইল বেশি জায়গা নেয়? আর বারবার স্টোরেজ শেষ হওয়ার সমস্যা থেকে মুক্তির আসলে উপায় কী?
ছবি ও ভিডিওতে শেষ হচ্ছে স্টোরেজ
ফোনের মেমোরি দ্রুত পূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ ছবি ও ভিডিও। বর্তমানে স্মার্টফোনে ৫০, ১০৮ এমনকি ২০০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরাও থাকছে। এসব ক্যামেরায় উচ্চ রেজল্যুশনে ছবি তুললে ফাইলের আকার বড় হয়। ফলে কয়েক’শ ছবি জমলেই ফোনের স্টোরেজের বড় একটি অংশ পূর্ণ হয়ে যায়।
ভিডিওর ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও বেশি জায়গা। সাধারণ মানের ভিডিওর তুলনায় ফুল এইচডি বা ফোরকে রেজল্যুশনে ধারণ করা ভিডিও অনেক বেশি জায়গা নেয়। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ভিডিও ধারণ করলে কয়েক মিনিটের ফুটেজেই কয়েক’শ মেগাবাইট (এমবি) থেকে কয়েক গিগাবাইট (জিবি) পর্যন্ত জায়গা লাগতে পারে।
অনেক সময় ছবি ও ভিডিও তোলার পর সেগুলো আর দেখা হয় না, কিন্তু ফোনেই থেকে যায়। একই ছবির একাধিক কপি, স্ক্রিনশট, অপ্রয়োজনীয় ভিডিও এবং সম্পাদনা করা ছবির মূল ফাইলও জায়গা দখল করে। ফলে নিয়মিত ছবি ও ভিডিও ধারণ করলে স্টোরেজ দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্যাশ ফাইল
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবের মতো অ্যাপ ব্যবহার করলেও ফোনের মেমোরি কমতে থাকে। এসব অ্যাপে ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট দেখার সময় সেগুলোর কিছু অংশ ফোনে সাময়িকভাবে সংরক্ষিত হয়। এগুলোকে ক্যাশ ফাইল বলা হয়।
ক্যাশ ফাইলের কারণে পরবর্তী সময়ে একই ছবি বা ভিডিও দ্রুত লোড হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন এসব অ্যাপ ব্যবহার করলে ক্যাশ ফাইলের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত রিলস দেখা, ভিডিও চালানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ব্রাউজ করলে অজান্তেই ফোনে অনেক অস্থায়ী ফাইল জমে।
এ ছাড়া অ্যাপের নিজস্ব ডেটা, সার্চের ইতিহাস, ব্যবহারকারীর পছন্দ ও বিভিন্ন সেটিংসও স্টোরেজ ব্যবহার করে। ফলে কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার সময় যতটুকু জায়গা লাগে, নিয়মিত ব্যবহারের পর সেটি তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা দখল করতে পারে।
হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের ফাইল
ফোনের মেমোরি পূর্ণ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ মেসেজিং অ্যাপ। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা অন্য কোনো অ্যাপে প্রতিদিন অসংখ্য ছবি, ভিডিও, ভয়েস মেসেজ, পিডিএফ ও নথি আদান-প্রদান হয়।
বিশেষ করে বিভিন্ন গ্রুপে নিয়মিত ছবি ও ভিডিও এলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোনে ডাউনলোড হতে পারে। অনেক সময় ব্যবহারকারী ফাইলগুলো দেখেনও না, কিন্তু সেগুলো ফোনের স্টোরেজে জমতে থাকে। একই ভিডিও একাধিকবার পাঠানো হলে একাধিক কপিও তৈরি হতে পারে। মেসেজিং অ্যাপের পুরোনো কথোপকথন, ডাউনলোড করা নথি এবং অপ্রয়োজনীয় মিডিয়া ফাইল নিয়মিত পরিষ্কার না করলে একসময় এসব ফাইলই স্টোরেজের বড় অংশ দখল করে নেয়।
গেম ও বড় অ্যাপ জায়গা নিচ্ছে
বর্তমানে স্মার্টফোনের অনেক অ্যাপ আগের তুলনায় বড় আকারের। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে আপডেট দেওয়া হলে এই আকার আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে অনলাইন গেম, ভিডিও সম্পাদনার অ্যাপ, ক্যামেরা অ্যাপ ও বিভিন্ন পেশাদার কাজের অ্যাপে উন্নত গ্রাফিকস এবং নতুন সুবিধা যুক্ত হচ্ছে। ফলে এসব অ্যাপ ইনস্টল করতে বেশি জায়গা প্রয়োজন হয়।
কিছু গেম ইনস্টল করার পর অতিরিক্ত মানচিত্র, গ্রাফিকস, শব্দ ও অন্যান্য ফাইল ডাউনলোড করে। ফলে ইনস্টল করার সময় অ্যাপের যে আকার দেখা যায়, ব্যবহারের পর সেটি আরও বড় হতে পারে। একইভাবে ভিডিও সম্পাদনার অ্যাপে তৈরি করা প্রকল্প, অস্থায়ী ফাইল ও সম্পাদিত ভিডিও ফোনের জায়গা দখল করে।
এ ছাড়া একই ধরনের একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করলেও স্টোরেজের ওপর চাপ বাড়ে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা অ্যাপ ও গেম ফোনে রেখে দিলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে জায়গা আটকে থাকে।
অপারেটিং সিস্টেম ও আপডেটের ফাইল
ফোনের বাক্সে ১২৮ বা ২৫৬ জিবি স্টোরেজ লেখা থাকলেও পুরো জায়গা ব্যবহারকারীর জন্য খালি থাকে না। ফোনের অপারেটিং সিস্টেম, আগে থেকে ইনস্টল করা অ্যাপ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সিস্টেম ফাইল স্টোরেজের একটি অংশ ব্যবহার করে। অ্যান্ড্রয়েড বা আইওএসের নতুন সংস্করণ ইনস্টল করার সময় অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে আপডেটের ফাইল ডাউনলোড ও ইনস্টল করার পাশাপাশি অস্থায়ী ফাইলও তৈরি হয়। বিভিন্ন অ্যাপের নতুন সংস্করণে বাড়তি সুবিধা যুক্ত হওয়ায় সেগুলোর আকারও বেড়ে যায়। ফলে নতুন ফোন কেনার সময় যে পরিমাণ খালি জায়গা পাওয়া যায়, কয়েক মাস বা বছর ব্যবহারের পর তা অনেক কমে যেতে পারে।
ডাউনলোড ফোল্ডারেও জমে থাকে ফাইল
ইন্টারনেট থেকে ছবি, ভিডিও, পিডিএফ, ডকুমেন্ট কিংবা বিভিন্ন ফাইল ডাউনলোড করার পর অনেকেই সেগুলো আর ব্যবহার করেন না। কিন্তু ফাইলগুলো ফোনে থেকে যায়।
ফলে ধীরে ধীরে ডাউনলোড ফোল্ডারেও অনেক জায়গা ব্যবহৃত হয়। অনেক সময় একই ফাইল একাধিকবার ডাউনলোড করা হয়। আবার ব্রাউজার থেকে ডাউনলোড করা পুরোনো নথি, ইনস্টল করা অ্যাপের এপিকে ফাইল এবং বিভিন্ন অস্থায়ী ফাইলও স্টোরেজে জমে থাকে। এসব ফাইল নিয়মিত পরীক্ষা না করলে অজান্তেই ফোনের মেমোরি পূর্ণ হয়ে যেতে পারে।
মেমোরি খালি করবেন যেভাবে
ফোনের স্টোরেজ খালি করার আগে কোন ধরনের ফাইল বেশি জায়গা নিচ্ছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। আন্দাজে ছবি বা অ্যাপ মুছে না দিয়ে প্রথমে ফোনের স্টোরেজ ব্যবহারের হিসাব দেখে নিতে পারেন।
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সেটিংস থেকে ‘স্টোরেজ’ অপশনে গেলে ছবি, ভিডিও, অ্যাপ, অডিও, ডাউনলোড ও সিস্টেম ফাইলের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আইফোনে সেটিংসের ‘আইফোন স্টোরেজ’ অপশনে গেলে কোন অ্যাপ কতটুকু জায়গা দখল করে রেখেছে, তা দেখা যায়।
১. অপ্রয়োজনীয় ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলা
ফোনের গ্যালারি থেকে প্রথমে অপ্রয়োজনীয় ছবি, ভিডিও, স্ক্রিনশট ও একই ছবির একাধিক কপি খুঁজে বের করুন। যেসব ভিডিও আর প্রয়োজন নেই, সেগুলো মুছে ফেলুন। তবে অনেক ফোনে ছবি বা ভিডিও মুছে ফেলার পরও সেগুলো ‘ট্র্যাশ’ বা ‘রিসেন্টলি ডিলিটেড’ ফোল্ডারে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকে। ফলে সেখান থেকেও ফাইল স্থায়ীভাবে মুছে ফেলতে হবে।
২. অ্যাপের ক্যাশ ফাইল পরিষ্কার করা
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সেটিংসের অ্যাপস অপশনে গিয়ে নির্দিষ্ট অ্যাপ নির্বাচন করে স্টোরেজ থেকে ক্যাশ ফাইল মুছে ফেলা যায়। এতে অ্যাপের অস্থায়ী ফাইল সরবে এবং কিছু জায়গা খালি হবে। তবে ক্যাশ পরিষ্কার করার সময় ‘ক্লিয়ার ডেটা’ বা ‘অ্যাপ ডেটা মুছুন’ অপশন ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। এতে অ্যাপের লগইন তথ্য, সেটিংস ও সংরক্ষিত ফাইল হারিয়ে যেতে পারে। আইফোনে অনেক অ্যাপের ক্যাশ পরিষ্কারের জন্য অ্যাপের নিজস্ব সেটিংস ব্যবহার করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অ্যাপ সরিয়ে আবার ইনস্টল করার প্রয়োজন হতে পারে।
৩. হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের অপ্রয়োজনীয় ফাইল সরানো
হোয়াটসঅ্যাপে ‘স্টোরেজ অ্যান্ড ডেটা’ অপশন থেকে ‘ম্যানেজ স্টোরেজ’ ব্যবহার করে কোন ফাইল বেশি জায়গা নিচ্ছে, তা দেখা যায়। বড় ভিডিও, একাধিকবার আসা ছবি এবং অপ্রয়োজনীয় নথি বেছে মুছে ফেলা যায়। এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপের স্বয়ংক্রিয় মিডিয়া ডাউনলোড বন্ধ বা সীমিত রাখা যেতে পারে। এতে প্রতিটি ছবি বা ভিডিও নিজে থেকে ফোনে জমবে না। মেসেঞ্জারসহ অন্যান্য অ্যাপেও অপ্রয়োজনীয় ডাউনলোড ও মিডিয়া ফাইল নিয়মিত পরিষ্কার করা ভালো।
৪. ব্যবহার না করা অ্যাপ ও গেম আনইনস্টল করা
ফোনে অনেক সময় এমন অ্যাপ থাকে, যেগুলো মাসের পর মাস ব্যবহার করা হয় না। এসব অ্যাপের প্রয়োজন না থাকলে আনইনস্টল করে দিন। বিশেষ করে বড় আকারের গেম, ভিডিও সম্পাদনার অ্যাপ ও একই কাজের একাধিক অ্যাপ সরিয়ে ফেললে উল্লেখযোগ্য জায়গা খালি হতে পারে। তবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ফাইল থাকলে আনইনস্টল করার আগে সেগুলোর ব্যাকআপ রাখা।
৫. ডাউনলোড ফোল্ডার পরিষ্কার করা
ফোনের ফাইল ম্যানেজার থেকে ডাউনলোড ফোল্ডার খুলে অপ্রয়োজনীয় পিডিএফ, ভিডিও, ছবি, ডকুমেন্ট ও এপিকে ফাইল মুছে ফেলুন। একই ফাইল একাধিকবার থাকলে অপ্রয়োজনীয় কপিগুলো সরিয়ে দিন। এতে ফোনের স্টোরেজের বাড়তি চাপ কমবে।
৬. ছবি ও ভিডিও ক্লাউড বা কম্পিউটারে রাখা
গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও ভিডিও ফোনে জমিয়ে না রেখে গুগল ফটোস, আইক্লাউড কিংবা অন্য কোনো ক্লাউড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা যায়। কম্পিউটার বা বাহ্যিক স্টোরেজেও ফাইলের ব্যাকআপ রাখা সম্ভব। তবে ক্লাউডে ছবি বা ভিডিও ঠিকভাবে ব্যাকআপ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে ফোন থেকে মূল ফাইল মুছে ফেলবেন না। ক্লাউড সেবায় বিনা মূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা পাওয়া যায়। এর বেশি ব্যবহার করতে হলে অর্থ খরচ করে অতিরিক্ত স্টোরেজ নিতে হতে পারে।
৭. স্টোরেজ পরিষ্কারের অ্যাপ ব্যবহারে সতর্ক থাকা
ফোনের জায়গা খালি করার নামে বিভিন্ন থার্ড পার্টি ক্লিনার অ্যাপ ব্যবহার করেন অনেকে। তবে সব অ্যাপ নিরাপদ বা কার্যকর নয়। কিছু অ্যাপ অপ্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপন দেখায়, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে কিংবা প্রয়োজনীয় ফাইল মুছে দেয়। এছাড়া নিরাপত্তা ঝুঁকি তো রয়েছেই।