ফ্রি ওটিটির আড়ালে সাইবার ফাঁদ, সতর্ক না থাকলেই বিপদ
অনেকে ওটিটিতে ফ্রি ভিডিও দেখতে পছন্দ করেন। কেননা এতে যেমন টাকা লাগে না, তেমন সব ধরনের ভিডিও দেখা যায়। একদিকে যেমন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ছে অন্যদিকে এসব প্ল্যাটফর্মের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। এখানে বিনা খরচে প্রিমিয়াম সিনেমা, সিরিজ বা খেলার সম্প্রচার দেখার সুযোগ দেওয়ার কথা বলে ব্যবহারকারীদের অনেক সময় ভুয়া ওয়েবসাইট বা অ্যাপের দিকে নেওয়া হচ্ছে।
সেখানে ক্লিক বা অ্যাপ ইনস্টল করার পর চুরি হতে পারে ব্যক্তিগত তথ্য, লগইন তথ্য এমনকি আর্থিক তথ্যও। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কির এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, ডিজনি+, অ্যাপল টিভি প্লাস ও এইচবিও ম্যাক্সের নাম ব্যবহার করে ক্ষতিকর বা অনাকাঙ্ক্ষিত ফাইল ছড়ানোর ৯৬ হাজার ২৮৮টি প্রচেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব প্রচেষ্টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল নেটফ্লিক্সের নাম ব্যবহার করে ৮৫ হাজার ৬৭৯টি।
‘ফ্রি প্রিমিয়াম’ অফারই বড় ফাঁদ
সাইবার অপরাধীরা ব্যবহারকারীর আগ্রহকে কাজে লাগিয়েই এসব প্রতারণা করে থাকে। বিশেষ করে নতুন সিনেমা, জনপ্রিয় সিরিজ কিংবা বহুল আলোচিত কোনো কনটেন্ট মুক্তির সময় ‘ফ্রি দেখা যাবে’ বা ‘প্রিমিয়াম সুবিধা বিনা খরচে’ এ ধরনের প্রলোভন দেখানো হয়।
২০২৪ সালে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, ডিজনি+, অ্যাপল টিভি প্লাস ও এইচবিও ম্যাক্সের নাম ব্যবহার করে ক্ষতিকর বা অনাকাঙ্ক্ষিত ফাইল ছড়ানোর ৯৬ হাজার ২৮৮টি প্রচেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব প্রচেষ্টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল নেটফ্লিক্সের নাম ব্যবহার করে ৮৫ হাজার ৬৭৯টি।
ক্যাসপারস্কির বিশ্লেষণে ‘নেটফ্লিক্স মোড এপিকে’-এর মতো অফারের কথাও উঠে এসেছে। এসব অ্যাপ বিনা সাবস্ক্রিপশনে প্রিমিয়াম কনটেন্ট দেখার সুযোগ দেওয়ার দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে এর ভেতরে ম্যালওয়্যার থাকতে পারে। অ্যাপ ইনস্টল করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ডিভাইস সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ম্যালওয়্যার ঢুকে গেলে শুধু স্ট্রিমিং অ্যাকাউন্ট নয়, ডিভাইসে থাকা ব্যক্তিগত তথ্যও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ক্যাসপারস্কি বলছে, এ ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যক্তিগত তথ্য বা আর্থিক তথ্য চুরি, গুপ্ত নজরদারি এবং ডিভাইসে অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ম্যালওয়্যার কি?
ম্যালওয়্যার হলো একটি ক্ষতিকর সফটওয়্যার। সাইবার অপরাধী বা হ্যাকাররা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কম্পিউটার, সার্ভার, স্মার্টফোন বা নেটওয়ার্কের ক্ষতি করা, গোপন তথ্য চুরি করা এবং ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এটি তৈরি করে থাকে।
নতুন সিনেমা ঘিরেও প্রতারণা
সাম্প্রতিক সময়ের একটি উদাহরণও সামনে এসেছে। গত ৯ আগস্ট-এর এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, নতুন সিনেমা দ্য ওডিসে বিনা মূল্যে অনলাইনে দেখানোর কথা বলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছিল। এসব ওয়েবসাইটে সিনেমাটি দেখার আগে ব্যবহারকারীদের নাম, ই-মেইল ও পরে ব্যাংকিং তথ্য দিতে বলা হয়। অথচ সেখানে সিনেমাটির কোনো বৈধ সংস্করণই ছিল না।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এসব ভুয়া সাইটকে বিশ্বাসযোগ্য দেখাতে ভুয়া রিভিউ ও রেটিং ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও আবার পপ-আপ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের এসব ওয়েবসাইটে নেওয়া হয়েছে। ক্যাসপারস্কির বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, অচেনা প্ল্যাটফর্মে সদ্য মুক্তি পাওয়া সিনেমা অস্বাভাবিকভাবে বিনা মূল্যে পাওয়া গেলে সেখানে না প্রবেশ করা ভালো।
শুধু তথ্য নয়, ঝুঁকিতে পুরো ডিভাইস
বিনা মূল্যে সিনেমা, সিরিজ বা খেলা দেখার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা সব সাইট যে ক্ষতিকর এমন নয়। তবে অননুমোদিত উৎস থেকে অ্যাপ বা ফাইল নামানো ব্যবহারকারীর জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইও সতর্ক করেছে, বিনা মূল্যে খেলা, টিভি অনুষ্ঠান বা সিনেমা দেখার কথা বলা কিছু স্ট্রিমিং ডিভাইস ও কনটেন্টে ম্যালওয়্যার বা ‘ব্যাকডোর’ থাকতে পারে। এগুলো কোনো ডিভাইস বা পুরো হোম নেটওয়ার্ককে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এফবিআই বিশেষভাবে অননুমোদিত অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড এবং ‘সাইডলোডিং’ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, স্ট্রিমিং স্টিক বা অ্যান্ড্রয়েড টিভি বক্সে অননুমোদিত অ্যাপ ইনস্টল করলে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ঢোকার ঝুঁকি বাড়ে।
অন্য খবর: কম্পিউটারে অ্যাপ ইন্সটল ছাড়াই হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েব থেকে হবে ভিডিও কল, যুক্ত হলো নতুন ৫ ফিচার
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিনা মূল্যে প্রিমিয়াম কনটেন্ট পাওয়ার লোভে অপরিচিত ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার না করাই সবচেয়ে নিরাপদ। অ্যাপ ডাউনলোডের ক্ষেত্রে পরিচিত ও অনুমোদিত অ্যাপ স্টোর ব্যবহার করতে হবে।
অচেনা কোনো ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড বা ব্যাংকিং তথ্য দেওয়ার আগে ঠিকানাটি ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। সন্দেহজনক পপ-আপ বা লিংকে ক্লিক না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
কোনো অ্যাকাউন্ট বা ডিভাইস আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ হলে দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, সন্দেহজনক কার্যক্রম পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা সফটওয়্যার দিয়ে ডিভাইস স্ক্যান করার পরামর্শ দিয়েছে ক্যাসপারস্কি। গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের নিরাপত্তা চালু রাখাও ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।