শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি রুখবে কে? চাপের মুখে টেক জায়ান্টরা
ক্যাপ-বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বজুড়ে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন ধরনের বৈশ্বিক চাপ তৈরি করছে সাম্প্রতিক এ প্রবণতা। গত বছর অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগের পর একের পর এক দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও নিয়ন্ত্রণমূলক আইন প্রণয়নের পথে হাঁটছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চালু করে। তখন অনেকেই পদক্ষেপটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগটি বিশ্বজুড়ে একটি নতুন নীতিগত প্রবণতার সূচনা করে।
এর পর চলতি বছরের মার্চে ইন্দোনেশিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের বেশির ভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া শুরু করে। একই পথে হেঁটেছে মালয়েশিয়া। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও ২০২৭ সালের শুরু থেকে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
প্রযুক্তি নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেক পলিসি প্রেসের প্রধান নির্বাহী ও সম্পাদক জাস্টিন হেনড্রিকসের মতে, অস্ট্রেলিয়ার পদক্ষেপটি এখন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি উদাহরণে পরিণত হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার বিভিন্ন উদ্যোগ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগই এর মূল কারণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, আসক্তি, অনলাইন হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্টে প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের দাবি আরো জোরালো হয়েছে।
তবে বিভিন্ন দেশে এসব নীতির ধরন ভিন্ন। অস্ট্রিয়ায় ১৪ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সীমাবদ্ধতার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ বছর। এছাড়া নরওয়ে বর্তমানে ১৩ বছরের নিচে থাকা নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়িয়ে ১৬ বছর পর্যন্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
কিছু দেশ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। পোল্যান্ড, ডেনমার্ক ও ইংল্যান্ডে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এদিকে ব্রাজিলে সব বয়সী শিক্ষার্থীর স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সেখানে ১৬ বছরের কম বয়সীরা অভিভাবকের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, এ প্রবণতা শিশুদের জীবনে প্রযুক্তির সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন। বর্তমানে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দেশের সরকার শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।
একই সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি চাপও বাড়ছে। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
অভিযোগে বলা হয়, এসব প্লাটফর্মের নকশা শিশুদের আসক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে এবং কোম্পানিগুলো শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি আলোচিত মামলায় মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পণ্য তৈরি করেছে যা শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে প্লাটফর্মে আটকে রাখে। মামলাটি প্রযুক্তি খাতের ওপর জনমত ও নিয়ন্ত্রক চাপ আরো বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে তৈরি হওয়া অভিজ্ঞতা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। অনেক নীতিনির্ধারক মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে যে ভুলগুলো হয়েছে, তা এআইয়ের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি করা উচিত হবে না।
টেক জায়ান্টরা বলছে, কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিশু-কিশোরদের আরো ঝুঁকিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রণহীন প্লাটফর্মের দিকে ঠেলে দিতে পারে। একই সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশও এসব নীতির সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞাকে ‘দ্রুত কিন্তু অকার্যকর সমাধান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বিষয়টি একক দেশের নীতিগত পরীক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।