০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭

৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে ৩ দাবি পূরণ না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সংবাদ সম্মেলনে অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী  © টিডিসি ফটো

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির আদেশ জারি, নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদান এবং আগামী ঈদুল ফিতর থেকে শতভাগ উৎসব ভাতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের নেতারা। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব দাবি পূরণ করা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও কর্মসূচির কথা জানান এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, আমরা দেশের ছয় লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের তিনটি ন্যায্য দাবি আপনাদের মাধ্যমে সরকার ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে উপস্থিত হয়েছি। আমাদের প্রথম দাবি, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির আদেশ অবিলম্বে জারি করতে হবে। একজন শিক্ষক নিজ জেলা বা এলাকার বাইরে চাকরি করার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছেন। অনেক শিক্ষক স্ত্রী-সন্তান ও অসুস্থ মা-বাবাকে রেখে শত শত কিলোমিটার দূরে চাকরি করছেন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার এবং নিজ বাড়ি থেকে ১৬৯ কিলোমিটার দূরে চাকরি করছি। দূরে অবস্থান করার কারণে আমার পক্ষে স্ত্রী-সন্তানদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। বদলি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একজন শিক্ষকের মানবিক ও পারিবারিক প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে বদলির প্রত্যাশায় শিক্ষকরা অপেক্ষা করছেন। তাই আর কোনো দীর্ঘসূত্রতা নয়, অবিলম্বে বদলির আদেশ জারি করতে হবে।

‘আমাদের দ্বিতীয় দাবি, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদান করতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বিশাল অংশ বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। অথচ একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব ও পেশাগত মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় তাদের জন্য নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’

অধ্যক্ষ আজিজী বলেন, আমাদের কর্মসূচি ঘোষণা এবং গত ৩১ অক্টোবর দেশের শতাধিক জেলা ও উপজেলায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ পালনের পরিপ্রেক্ষিতে ১ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, শিক্ষাসচিব ও অর্থসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তবে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষকদের নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে এখন পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ে কোনো চিঠি পাঠানো হয়নি। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষকদের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে দ্রুত চিঠি পাঠাতে হবে। আমরা শুধু উদ্যোগ নয়, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন চাই।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমাদের তৃতীয় দাবি, আগামী ঈদুল ফিতর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদান করতে হবে। একজন শিক্ষক সারা বছর শিক্ষার্থীদের মানুষ করার দায়িত্ব পালন করেন। অথচ ঈদের মতো ধর্মীয় ও পারিবারিক আনন্দের সময়েও তাঁকে প্রাপ্য উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। একজন শিক্ষক-কর্মচারীকে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা দেওয়া হয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বৈষম্যমূলক। আমরা আর কোনো আশ্বাস বা অনির্দিষ্ট সময়সীমা চাই না। আগামী ঈদুল ফিতর থেকেই শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদানের সুস্পষ্ট ঘোষণা ও কার্যকর ব্যবস্থা চাই।

‘পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৪ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার আমাদের তিনটি দাবির মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দ্বিতীয় দাবিটি মেনে নেওয়ায় এবং রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলমান শ্রমিক আন্দোলনসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

তিনি উল্লেখ করেন, এ কারণে আমরা আউটডোর কর্মসূচি পরিবর্তন করে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ইনডোর সংবাদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি কোনোভাবেই আমাদের কর্মসূচি স্থগিত করা নয়। বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মসূচির ধরন ও স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। আমাদের তিন দফা দাবি এবং দাবি আদায়ের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। আমরা সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন করছি না। আমরা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা এবং ছয় লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কথা বলছি। আমরা সংঘাত চাই না, বিশৃঙ্খলা চাই না। আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমে সম্মানজনক সমাধান। কিন্তু বছরের পর বছর আশ্বাস দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের অপেক্ষায় রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

শেষে তিনি বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট—তিন দফা দাবি মেনে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে হবে। শুধু আশ্বাস, আশ্বস্ত করার বক্তব্য কিংবা অনির্দিষ্ট সময়ের প্রতিশ্রুতিতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, ছয় লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবন-জীবিকা ও মানবিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে আমাদের তিন দফা দাবি পূরণ করা না হলে জোটের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।