পদোন্নতির দাবিতে মাউশিতে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অবস্থান
বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএসের পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা পদোন্নতির সরকারি আদেশ (জিও) জারির দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন। রবিবার (২৫ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি শুরু করেন তারা। পদোন্নতির সরকারি আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি, দীর্ঘ প্রায় নয় বছর ধরে তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত। অথচ একই সময়ে যোগদানকারী অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ২০২৩ সালেই পদোন্নতি পেয়েছেন। দীর্ঘদিনের এ প্রশাসনিক বৈষম্য, দীর্ঘসূত্রতা ও পেশাগত স্থবিরতার প্রতিবাদে তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হয়েছেন।
কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সরকার শিক্ষার মানোন্নয়ন, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিক ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও দেখা গেছে। তবে কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এতে তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে হতাশা তৈরি হয়েছে। ঈদ, পূজা ও শিক্ষক দিবসের আনন্দও পদোন্নতিবঞ্চনার কারণে ম্লান হয়ে গেছে।
তাদের আশঙ্কা, সরকার ঘোষিত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে পদোন্নতিবঞ্চিত শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা একই ব্যাচের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তুলনায় মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আর্থিক বৈষম্যের মুখে পড়বেন। দীর্ঘদিনের পদোন্নতিবঞ্চনার সঙ্গে নতুন এই আর্থিক বৈষম্য যুক্ত হলে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পেশাগত মর্যাদা, আর্থিক অধিকার ও কর্মস্পৃহা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকার পরও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বছরের পর বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে কেন? বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা সম্পন্ন হওয়ার পরও সরকারি আদেশ জারি হচ্ছে না কেন? এ বিষয়ে বারবার আবেদন, স্মারকলিপি ও প্রতিবাদ জানানোর পরও কেন পদোন্নতি মিলছে না?
তারা আরও বলেন, সরকারকে বিব্রত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নিরসন না হওয়ায় প্রতিবাদ ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তাদের এ অবস্থান কোনো অনুগ্রহের আবেদন নয়, বরং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির লক্ষ্যে গত ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এসব সভার পরও পদোন্নতির সরকারি আদেশ জারি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের কাছে এ পরিস্থিতি হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের দাবি, ১৩ ব্যাচ জুনিয়র ৪৯তম বিসিএসের নবীন কর্মকর্তারাও একই প্রভাষক পদে যোগ দিচ্ছেন। জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বছরের পর বছর একই পদে আটকে থাকার এ পরিস্থিতি তাদের সামাজিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, গত ১৩ অক্টোবর বগুড়ায় ৪৯তম বিসিএসের নবীন কর্মকর্তাদের যোগদান অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তাদের পদোন্নতিসংক্রান্ত দাবিগুলো নোট করে ফাইলে রাখতে নির্দেশ দেন। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ উদ্যোগ পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তবে পূজার আগে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন।
পদোন্নতির পথ সুগম করতে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল বলেও জানান তারা। তাদের অভিযোগ, অন্যান্য ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতির পাশাপাশি একাধিক স্তরে পদোন্নতি ও সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির নজির থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারে দীর্ঘসূত্রতা ও বৈষম্য রয়ে গেছে। পদোন্নতির সরকারি আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত মাউশি প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা।
তিন দফা দাবি
১. গত ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ডিপিসির সভার আলোকে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সরকারি আদেশ অবিলম্বে জারি করতে হবে।
২. প্রযোজ্য বিধিমালা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা অনুসারে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধাসহ পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিত, স্বচ্ছ ও সময়বন্ধ পদোন্নতি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
৩. পদোন্নতির জট নিরসনে প্রয়োজনীয় সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করতে হবে এবং স্বাস্থ্য ক্যাডারের অনুরূপ ব্যবস্থার আলোকে শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক পদকে গ্রেড-৩-এ উন্নীত করার উদ্যোগ নিতে হবে।