১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৫

তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া ঢাবি আদেশ অনুযায়ী বেআইনি: শিক্ষক নেটওয়ার্ক

তাসনিম সিরাজ মাহবুব  © টিডিসি সম্পাদিত

শ্রেণিকক্ষে নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে কটাক্ষ করার অভিযোগ ওঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সক ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক দাবি করেছে, এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশ অনুযায়ী বেআইনি। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে শিক্ষকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়, এখানে যা মানা হয়নি। আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এ দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই প্লাটফর্‌মটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৭ অক্টোবরের এ ঘটনায় ইংরেজি বিভাগ ইতিমধ্যে বিনা তদন্তে ও অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই ‘জরুরি সভা’ আয়োজনের মাধ্যমে তাসনিম সিরাজ মাহবুবের কোর্সগুলো থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দিয়েছে। আশ্চর্য বিষয় হলো, এ কাজে শিক্ষার্থীদের চাইতে শিক্ষকদের বেশি আগ্রহী মনে হয়েছে। শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেন ৮ অক্টোবর (সময় উল্লেখ নেই)। বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সভা হয় সকাল ১১টায়। কিন্তু, এই সভাটি ডাকা হয় ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ। অর্থাৎ তখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি; কিন্তু, বিভাগ বিধিবহির্ভূতভাবে জরুরি সভার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে! শারীরিক অসুস্থতার জন্য তাসনিম সিরাজ মাহবুব এই জরুরি সভায় অংশ নিতে পারেননি। তাকে বিভাগীয় সভাপতি স্বাক্ষরিত সভার সিদ্ধান্ত জানানো হয় ৮ অক্টোবর। এ বাদে বিভাগ অন্য কোনো উপায়ে তার সাথে কথা বলেনি। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে এই উপসংহারে আসা যায় যে, ইংরেজি বিভাগ সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার পরিপন্থী, ষড়যন্ত্রমূলক, একপেশে এবং নিপীড়নমূলক একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে তাসনিম সিরাজ মাহবুবের ওপর।  

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইংরেজি বিভাগের প্রধান, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নীল দলের সমর্থনে এক সময়ের নির্বাচিত সিনেট সদস্য ছিলেন, সকল নিয়মকানুন জেনেই নিয়মভঙ্গের সভা পরিচালনা করেছেন। একজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সাথে একবার কথা বলার প্রয়োজন বিভাগীয় প্রধান বোধ করেননি। কোনো আইনে একজন ব্যক্তিকে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শাস্তি দেয়া যায় না। তিয়াত্তরের আদেশ অনুযায়ীও বিষয়টি তাই। ইংরেজি বিভাগ সেটাই লঙ্ঘন করেছে। শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় শিক্ষার্থীর অধিকার ক্ষুণ্ন হয়ে থাকলে, অভিযোগ করা যেমন একজন শিক্ষার্থীর অধিকার, তেমনই শিক্ষকের অধিকার আছে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের। অথচ, ইংরেজি বিভাগ শিক্ষককে সেই সুযোগই দেয়নি!

‘‘এছাড়া, এই পুরো ঘটনাটিকে গত দুই বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও পর্যালোচনা করতে হবে। আমাদের জানা আছে যে, গত দুই বছরে তাসনিম সিরাজ নানাভাবে একটি উগ্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে নিয়মিত সামাজিক মাধ্যমে হেনস্তা এবং প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে আসেছেন। যার ফলে হঠাৎ উদ্ভূত পরিস্থিতির পটভূমিতে তিনি খানিকটা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাধিক আলোচনা সভা, বিতর্ক ও মতবিনিময়ে অংশ নিয়ে তাসনিম সিরাজ তাঁর বক্তব্যের কারণে, বিভিন্ন বেনামি হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালিগালাজ, চরিত্রহননের চেষ্টা এবং জীবননাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতার কারণে দুই বছর ধরে তিনি অভ্যুত্থান-পরবর্তী ডামাডোল-উদ্ভূত ট্রমা বা মানসিক অভিঘাত বয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০২৪-এর গণ-আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে একটি উগ্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে এবং তারা উদারপন্থী শিক্ষক-নাগরিকদের নানানভাবে হেনস্তা করছে। এশিয়া-প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষককে কাছাকাছি ধরনের একটি ঘটনায় চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, যা মব তৈরির মাধ্যমে ঘটানো হয়েছিল।’’

বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ছাত্র শিবির নিয়ন্ত্রিত ডাকসু ও ছাত্রী সংস্থা। যে দ্রুততম সময়ে তারা এই ঘটনাটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ করেছে, তাতে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। এছাড়া, সাম্প্রতিক প্রবণতারই ধারাবাহিকতায় নানান ভুঁইফোঁড় ডিজিটাল পত্রিকা, অনলাইন ‘বট’ অ্যাকাউন্ট, এবং কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম ঘটনা ঘটতে না ঘটতেই সত্য-মিথ্যার মিশেলে একটি অপতথ্যের ক্যাম্পেইন শুরু করে দেয়, যা রীতিমতো অনলাইন ট্রায়ালের মুখোমুখি করিয়ে দিয়েছে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজও এদেশের মুক্তচিন্তার সূতিকাগার। আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই যে, শিক্ষকের ক্লাসের বক্তব্যকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা, সম্পর্কের সার্বভৌমত্ব ও আস্থার জায়গা হিসেবে সবচেয়ে উপরে স্থান দিতে হবে। যেহেতু তাসনিম সিরাজ মাহবুব বহুদিন ধরেই একটি সুনির্দিষ্ট ঘৃণাবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, ফলে, তাঁকে বিপদে ফেলার মধ্য দিয়ে সেই গোষ্ঠীর কাছে মাথা নত করানোর ব্যবস্থা করতেই এতো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, অপতথ্য প্রচার ও সবিশেষে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাকে পরাভূত করার আয়োজন বলে মনে আমরা মনে করছি। 

এই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, ইংরেজি বিভাগ যে পদ্ধতিতে তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দিয়েছে, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশ অনুযায়ী বেআইনি। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে শিক্ষকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়, যা মানা হয়নি। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কাছে পাঠানো যেত, কিন্তু তা মানা হয়নি এবং এর পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে আমরা সন্দেহ করি। কাজেই পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানাই। 

ব্যক্তিগত ও পাবলিক পরিসরে যে কেউ যেকোনো পোশাক পরতেই পারেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিক কিছু কিছু ক্ষেত্রে (যেমন পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র, ভর্তি পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা, এমনকি ক্লাসেও) প্রয়োজন অনুযাীয় মুখ দেখানো, ক্ষেত্রবিশেষে সার্বক্ষণিকভাবে চোখ অনাবৃত রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে অসংজ্ঞায়িত অস্পষ্টতা প্রায়ই নানা স্তরে নিপীড়নের ঝুঁকি তৈরি করছে। এ ধরনের অস্পষ্টতার সূত্র ধরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও নিপীড়ন ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের অধিকার ও দায় নির্দিষ্ট করতে হবে। 

অনুমতি ছাড়া শিক্ষকের বক্তব্য ধারণ করা ও অনলাইনে খণ্ডিতভাবে ছড়িয়ে দিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপতথ্যমূলক ক্যাম্পেইন করা সাইবার অপরাধ। যারা এই কাজ করেছে, তাদের যথোপযুক্ত আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।