বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপনে সরকারের বড় উদ্যোগ, কীভাবে এলো দিনটি
একটি শ্রেণিকক্ষ। সামনে সারি সারি শিক্ষার্থী। হাতে বই, বোর্ডে লেখা কিছু কথা। আর সেই কথাগুলোকে ঘিরেই তৈরি হয় জ্ঞান, প্রশ্ন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রজন্মের গল্পে এমন কোনো না কোনো শিক্ষক থাকেন, যাঁর কাছ থেকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পাঠ পেয়েছে মানুষ। সেই শিক্ষকদের অবদান স্মরণ করতেই প্রতিবছর ৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
৫ অক্টোবরের গল্পটি কেবল ফুল, শুভেচ্ছা কিংবা শিক্ষকদের সম্মান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে ছয় দশকের আন্তর্জাতিক ইতিহাস। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সুপারিশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২৮ বছর পর সেই দিনটিই পায় বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পরিচয়।
আর ২০২৬ সালে সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক পূর্ণ হচ্ছে। এ বছর ১৯৬৬ সালের আইএলও-ইউনেসকোর ‘শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক সুপারিশ’-এর ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সেই উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে শিক্ষকতা পেশার বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশও এবার দিবসটি ঘিরে নিয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। ৫ অক্টোবর দেশের ১০০ গুণী শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
যে দিনটি বদলে দিল ৫ অক্টোবরের পরিচয়
১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শিক্ষকদের অবস্থান নিয়ে একটি বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলন বসে। সেখানে ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে ‘Recommendation concerning the Status of Teachers’ গ্রহণ করে।
৫ অক্টোবরের গল্পটি কেবল ফুল, শুভেচ্ছা কিংবা শিক্ষকদের সম্মান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে ছয় দশকের আন্তর্জাতিক ইতিহাস। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সুপারিশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২৮ বছর পর সেই দিনটিই পায় বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পরিচয়।
সুপারিশটিতে শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁদের প্রাথমিক প্রস্তুতি, পরবর্তী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, নিয়োগ, চাকরির শর্ত এবং শিক্ষাদান ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষক কী ধরনের অধিকার ও মর্যাদা পাবেন এবং কোন পরিবেশে কাজ করবেন—সেসব বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হয়।
এরপরও শিক্ষকতার পরিধি ও বাস্তবতা বদলেছে। উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের বিষয়টি সামনে রেখে ১৯৯৭ সালে ইউনেসকো ‘উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকতারত ব্যক্তিদের মর্যাদা বিষয়ক সুপারিশ’ গ্রহণ করে। এটি ১৯৬৬ সালের সুপারিশকে আরও বিস্তৃত করে।
এরও আগে ১৯৯৪ সালে ইউনেসকো ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই থেকে প্রতিবছর দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি শুধু শিক্ষকদের অবদান উদ্যাপন করে না, তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, অধিকার ও পেশাগত মর্যাদা নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করে।
ছয় দশক পর বদলে গেছে শিক্ষকতার চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালে এসে সেই ১৯৬৬ সালের সুপারিশের বয়স ৬০ বছর। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে শিক্ষাব্যবস্থাও। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয় এখন শিক্ষকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ইউনেসকো বলছে, এসব পরিবর্তন শিক্ষকদের সামাজিক, পেশাগত ও বস্তুগত মর্যাদার ওপর প্রভাব ফেলছে। কোথাও শিক্ষকতা পেশা যথেষ্ট স্বীকৃতি পাচ্ছে না, কোথাও শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নীতিনির্ধারণে মতামত দেওয়ার সুযোগ সীমিত। আবার কম বেতন, অতিরিক্ত কর্মভার ও অনুকূল কর্মপরিবেশের অভাবও শিক্ষকদের কাজকে কঠিন করে তুলছে।
এ কারণেই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু অতীতের একটি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের ৬০ বছর পূর্তি উদ্যাপন নয়। বরং আগামী দিনে শিক্ষকতা পেশাকে কীভাবে আরও মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও কার্যকর করা যায়, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
এবারের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে: পেশা সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’। প্রতিপাদ্যটির মধ্যেই এবারের আয়োজনের মূল বার্তা স্পষ্ট। দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের পেশাগত মর্যাদা ও কাজের পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
৫ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দপ্তরে আয়োজিত বৈশ্বিক অনুষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হবে। একই অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে ইউনেসকো-হামদান পুরস্কারের শিক্ষক উন্নয়নবিষয়ক নবম আসরের পুরস্কার বিতরণী।
বাংলাদেশে এবার ১০০ গুণী শিক্ষক
আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশেও এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে ঘিরে বড় পরিসরে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন নীতিমালা-২০২৬’ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্তরের ১০০ জন গুণী শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে। এর আগে জাতীয় পর্যায়ে ১২ জন শিক্ষককে এই সম্মাননা দেওয়া হতো। এবার সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: অক্টোবরের সঙ্গে ৩ মাসের বকেয়া বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ৫ অক্টোবর নির্বাচিত ১০০ শিক্ষককে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে। শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচিত শিক্ষকদের সম্মাননা সনদ ও ক্রেস্ট দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এক সময় শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল শিক্ষকের কাজের স্বীকৃতি। সময়ের সঙ্গে সেই স্বীকৃতি এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। ৫ অক্টোবরের ইতিহাসও যেন সেই পরিবর্তনেরই সাক্ষ্য দেয়।
১৯৬৬ সালে শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে আন্তর্জাতিক সুপারিশ গ্রহণ থেকে ১৯৯৪ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের যাত্রা—প্রতিটি ধাপেই শিক্ষকতা পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করার চেষ্টা দেখা যায়। আর ২০২৬ সালে এসে সেই ইতিহাসের ৬০ বছর পূর্তিতে বিশ্ব আবারও ফিরে তাকাচ্ছে শিক্ষকদের দিকে।
বাংলাদেশে ১০০ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগও সেই ফিরে তাকানোরই একটি জাতীয় রূপ। কারণ একজন শিক্ষক শুধু একটি পাঠ শেষ করেন না; অনেক সময় একটি শিক্ষার্থীর চিন্তার দরজা খুলে দেন। আর সেই চিন্তা থেকেই তৈরি হয় পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।