বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা জরুরি
দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মারদিয়া মমতাজ। আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের (ইউটিএল) প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ মন্তব্য করেন তিনি।
এমপি মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘শিক্ষকতা শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করার দায়িত্ব নয়, বরং একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। তাই একজন শিক্ষকের জ্ঞান, প্রস্তুতি, ব্যক্তিত্ব ও শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার দক্ষতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থাও জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় ক্লাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের বলি, সবাই ফোন বের কর, সামনে রাখ। আমি টপিক লিখে দিলাম, এটা সার্চ কর। বিষয়টি নিয়ে ঘাটাঘাটি কর। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ব্যবহার করলেও সেটি হয় নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। ফলে তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফোনে সময় নষ্ট করার সুযোগ পায় না।’
‘দেশে অনেক মেধাবী নতুন শিক্ষক রয়েছেন, যাদের ফলাফল ভালো। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণ তাদের থাকে না। অনেকেই উচ্চশিক্ষা বা বিসিএসের প্রস্তুতির পাশাপাশি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে থাকেন। ক্লাস নেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রস্তুতির পড়াশুনা করছেন অর্থ্যাৎ শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য তিনি কোনো প্রস্তুতিই নিচ্ছেন না। আবার ক্লাস শেষে আবার নিজের ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এটি দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য দুর্ভাগ্যজনক এবং শিক্ষার্থীদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মারদিয়া মমতাজ বলেন, একসময় অফিসে বসে হেডফোন ব্যবহার করে প্রতিটি ক্লাসের আগে প্রস্তুতি নিতাম। একদিন একজন ক্লাস প্রতিনিধি এসে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি প্রত্যেক ক্লাসের আগে পড়েন? আমরা তো ভাবতাম সেমিস্টারের শুরুতে একবার পড়ে পুরো কোর্স পড়ানো হয়।’ এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, অনেকের কাছেই নিয়মিত প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাস নেওয়ার সংস্কৃতি অস্বাভাবিক বলে মনে হয়।
তিনি বলেন, ‘এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কেমব্রিজে কর্মরত থাকার সময় সেখানে পূর্বঘোষণা ছাড়াই ক্লাস মনিটরিং করা হত। পর্যবেক্ষণের পর শিক্ষক ও পর্যবেক্ষক একসঙ্গে বসে আলোচনা করতেন, পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উভয়ে স্বাক্ষর করে প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়া হত। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। বরং অনেক শিক্ষকই মনে করেন, তাদের ক্লাসে কেউ পর্যবেক্ষণে আসা উচিত নয়। বর্তমানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, সেটির কার্যকর মূল্যায়নের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নেই।’
এমপি মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘ইউটিএল’ কর্মসূচির মূল ভিত্তি চারটি—জ্ঞান, আত্মমর্যাদা, বিশ্বাস ও স্বাধীনতা। একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, আচরণ, পাঠদানের ধরন এবং শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার মধ্য দিয়েই এসব মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে যায়। যদি এগুলো নিজের মধ্যে না থাকে, তাহলে একজন শিক্ষকের নিজেরই আত্মসমালোচনা করা উচিত।
তিনি বলেন, সম্প্রতি ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু একজন শিক্ষককে একটি ট্যাব দেওয়া হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শিক্ষাখাতে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলা হলেও সেগুলোর আগে প্রয়োজনভিত্তিক মূল্যায়ন হওয়া উচিত ছিল।