০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:২৮

একসঙ্গে স্কুল-কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে জমজ দুই বোন

জমজ দুই বোন লামিয়া ও সামিয়া  © সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে ২০০৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয় জমজ দুই বোন—ইসরাত জাহান লামিয়া ও নুসরাত জাহান সামিয়া। জন্মের পর থেকেই যেন একে অপরের পরিপূরক তারা। একই সময়ে পৃথিবীতে আসা, একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, শৈশবের দুরন্ত দিনগুলো ভাগাভাগি করা—সবকিছুতেই ছিল তাদের যুগল উপস্থিতি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে জীবনের পরিসর, এসেছে নতুন অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বদলায়নি পাশাপাশি থাকার অভ্যাস। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেও তারা একে অপরের সঙ্গী। শৈশবের সেই খেলার সঙ্গীরাই আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহপাঠী। 

দুই বোনের শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি ঘোড়াদাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি একসঙ্গে পথচলা। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় একজন জিপিএ-৫ এবং অন্যজন জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এরপর তারা ভর্তি হয় বাজিতপুর রাজ্জাকুন্নেছা আর এন সরকারি পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় দুজনই জিপিএ-৫ অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে বাজিতপুর সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগে উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা চালিয়ে যায় তারা। ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজন জিপিএ-৪.৫৮ এবং অন্যজন জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার অভিজ্ঞতা তাদের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। 

উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে শুরু হয় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের নতুন অধ্যায়—বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধ। স্কুল-কলেজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন এক প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় প্রবেশ করতে হয় তাদের। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, পড়াশোনার চাপ, অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে সময়টি ছিল পরিশ্রম ও মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা। এই কঠিন সময়ে তারা শুধু পড়াশোনার সঙ্গীই ছিল না, একে অপরের মানসিক শক্তি হিসেবেও কাজ করেছে। কোনো একজনের মন খারাপ হলে অন্যজন সাহস জুগিয়েছে, প্রস্তুতির ব্যস্ততায় একে অপরকে উৎসাহ দিয়েছে। নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় তারা। শেষ পর্যন্ত দুজনের গন্তব্য হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে তারা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত। 

একসঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ও এই দীর্ঘ পথচলা নিয়ে ইসরাত জাহান লামিয়া বলেন, ‘আমরা দুই বোন ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে একে অপরের পাশে থেকে নিজেদের সামলে নিয়েছি। আমাদের এই পথচলায় পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তার কথায়, দুই বোনের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি আশপাশের মানুষের সহযোগিতাও তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

অন্যদিকে নুসরাত জাহান সামিয়া মনে করেন, স্বপ্ন দেখা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীর নিজের চেষ্টা যেমন জরুরি, তেমনি পরিবার, শিক্ষক ও কাছের মানুষদের সহযোগিতাও প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমরা সৌভাগ্যবান যে আমাদের এই যাত্রায় সবাই পাশে ছিলেন। বিশেষ করে আমাদের বড় বোন ফারজানা ইয়াসমিন জেমীর অবদান কখনো ভোলার নয়। ভর্তি পরীক্ষার সময় নিজের পড়াশোনা ও টিউশন সামলানোর পাশাপাশি তিনি হলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য রান্না করেছেন, বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং কঠিন সময়ে আমাদের আগলে রেখেছেন। ভর্তি প্রস্তুতির ব্যস্ত সময়ে বড় বোনের এই সহযোগিতা তাদের কাছে ছিল নির্ভরতা ও সাহসের উৎস। 

দুই মেয়ের সাফল্যে গর্বিত বাবা মো. সালেক ফরিদ। তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, বাবা হিসেবে আজ আমি গর্বিত। আমার দুই মেয়ে তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তারা সবসময় একে অপরের পাশে থাকে। বিষয়টি আমাকে অনেকটা নিশ্চিন্ত রাখে। দোয়া করি, তারা এভাবেই একে অপরের পাশে থেকে জীবনে আরও সফল হোক। বাবার এই গর্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা ও প্রত্যাশাও। 

পরিবারের আরেক সদস্য, তাদের ছোট চাচা মো. নাসির উদ্দীন সবিরও দুই বোনকে নিয়ে আশাবাদী। তাঁর ভাষায়, তাদের দুজনকে নিয়ে আমাদের সবার অনেক প্রত্যাশা। তারা ইতোমধ্যে আমাদের প্রত্যাশা পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও নিজেদের পাশাপাশি দেশ ও জাতির উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি। পরিবারের সদস্যদের এমন প্রত্যাশা দুই বোনের পথচলায় অনুপ্রেরণা জোগায়। 

জমজ হওয়ায় জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে লামিয়া ও সামিয়া। তবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে, একই ইনস্টিটিউটে পড়ার অভিজ্ঞতা তাদের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ক্লাস, পড়াশোনা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতা—সবকিছুতেই পাশে পাওয়া যায় পরিচিত সেই মানুষটিকে, যার সঙ্গে জীবনের শুরু থেকেই পথচলা। নিজের আপন বোনকে সহপাঠী হিসেবে পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের। আর স্বপ্নপূরণের পথে একে অপরের শক্তি হয়ে ওঠা আরও বড় প্রাপ্তি। 

শৈশবের খেলাধুলা থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি বাঁকে একসঙ্গে পথচলা—লামিয়া ও সামিয়ার গল্প এক অনন্য বোনত্বের বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। তাদের এই যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, সাফল্যের পথে ব্যক্তিগত অধ্যবসায়ের পাশাপাশি পাশে থাকা মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতাও বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। একই আকাশের নিচে, একই স্বপ্নকে সঙ্গী করে দুই বোনের এই এগিয়ে চলা হয়ে উঠুক আগামীর অনুপ্রেরণা।