সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন থেকে বুয়েট, মাত্র তিন মাসের প্রস্তুতিতে বিসিএসে অডিট ক্যাডার শোভন
ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল সেনা কর্মকর্তা হওয়ার। সেই স্বপ্ন থেকেই ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়া। পরে প্রকৌশলী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগে পড়াশোনা। স্নাতক শেষে ইচ্ছা ছিল বিদেশে গিয়ে পিএইচডি করার। কিন্তু বাবা-মায়ের পাশে থাকার সিদ্ধান্তে বদলে যায় পরিকল্পনা। প্রকৌশল খাতে ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে শুরু করেন বিসিএসের পড়াশোনা। মাত্র তিন মাসের প্রস্তুতিতে ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে খালিদ মাহমুদ শোভন এখন অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারের কর্মকর্তা।
২০২২ সালে বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন শোভন। এরপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তখন তার পরিকল্পনা ছিল দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া। তবে বাবা-মা বাসায় একা থাকায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। দেশে থেকেই ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভাবলেও প্রথম পছন্দ ছিল প্রকৌশল খাতে কাজ করা। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই বিসিএসের দিকে এগোন তিনি।
শোভন বলেন, ‘২০২২ সালে আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়। তখন পর্যন্ত বিসিএস দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। অন্য অনেক বুয়েটিয়ানের মতো আমারও ইচ্ছা ছিল দেশের বাইরে গিয়ে পিএইচডি করার। কিন্তু বাবা-মা বাসায় একা থাকায় বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিই। পরে সরকারি চাকরির কথা ভাবি। প্রকৌশল খাতে চাকরি করার ইচ্ছা থেকেই অনেকটা বাধ্য হয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করি।’
অল্প সময়ে বিসিএসের বিশাল সিলেবাস শেষ করা সহজ ছিল না। প্রস্তুতির সময় হতাশ হলেও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে পড়াশোনা চালিয়ে যান শোভন। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষার সময় তিনি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য তার পরামর্শ, পড়ার ঘণ্টা হিসাব করার চেয়ে সিলেবাসের কতটুকু শেষ হলো, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘মাত্র তিন মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করায় অনেক সময় হতাশ হয়ে যেতাম। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস ছিল। বিসিএসের ক্ষেত্রে ঘণ্টার ওপর টার্গেট সেট না করে সিলেবাসের ওপর টার্গেট সেট করা উচিত।’
বিসিএসের পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষা, ব্যাংকিং বা অন্য চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে মূল লক্ষ্য থেকে মনোযোগ সরে যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। তাই প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোনোর পরামর্শ দেন শোভন।
আরও পড়ুন: প্রতিকূলতার মধ্যেই টিউশনি করে প্রস্তুতি, শিক্ষার পর কৃষি ক্যাডার সোহেলের বিসিএস জয়ের গল্প
শোভনের পথচলায় পরিবারের সমর্থন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার বোন ৪০তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। বোনের সাফল্য তাকে অনুপ্রাণিত করেছে; বাবা-মায়ের সমর্থনও দিয়েছে এগিয়ে যাওয়ার সাহস।
৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও চূড়ান্ত গেজেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ফল প্রকাশের পর সুপারিশপ্রাপ্ত হন শোভন। এরপর মেডিকেল পরীক্ষা, ভেরিফিকেশনসহ প্রয়োজনীয় ধাপ শেষে গেজেটভুক্ত হন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই মুহূর্ত তার কাছে ছিল বিশেষ আনন্দের।
শোভন বলেন, ‘গেজেটেড হওয়ার ওই সময়টা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আব্বু-আম্মুসহ পরিবারের সবাই অনেক খুশি হয়েছেন।’
প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করলেও শোভনের বর্তমান কর্মক্ষেত্র অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডার। নিজের প্রযুক্তিগত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সরকারি নিরীক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়াতে চান তিনি। শোভন বলেন, ‘অডিট কার্যক্রমে এআইয়ের প্রয়োগ কাজের দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। আমি যেহেতু প্রকৌশল ব্যাকগ্রাউন্ডের, তাই অডিট ক্যাডারে এআইয়ের ইমপ্লিমেন্টেশন করার ইচ্ছা আছে।’
সরকারি চাকরিকে শুধু পেশা হিসেবে দেখেন না তিনি। ক্যাডেট কলেজ ও বুয়েটে সরকারের অর্থায়নে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা থেকে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছে বলে জানান শোভন। তিনি বলেন, ‘অডিট ক্যাডারে আসার মূল কারণ ছিল জনগণের জন্য কিছু করা। যেহেতু ক্যাডেট কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের টাকায় পড়াশোনা করেছি, তাই দেশের মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা আছে।’