‘জীবন মানে নিজের সাথে সংগ্রাম’— প্রথম শ্রেণি থেকে মাস্টার্সের গল্প লিখলেন সহকারী জজ তাইজুল
জীবনের শুরু থেকেই একের পর এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন এস এম তাইজুল ইসলাম। পড়াশোনায় শুরুতে পিছিয়ে থাকা, ছোটবেলায় পায়ের সমস্যা, অষ্টম শ্রেণিতে অস্ত্রোপচার, বাবাকে হারানো, দারিদ্র্য এবং পরে কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ার মতো কঠিন সময় পার করেছেন তিনি। কিডনি প্রতিস্থাপনের পরও থামেনি তার লড়াই। বিসিএস, বিজেএস ও ব্যাংকের পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। তবে হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ এই সংগ্রামের পর ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে জীবনের শুরু থেকে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত পথচলার গল্প তুলে ধরেন তাইজুল।
তাইজুল জানান, ছোটবেলায় তিনি ভালো ছাত্র ছিলেন না। তবে নিয়মিত পড়াশোনা করতেন। অন্যরা পারলে তিনিও পারবেন—এই জেদ তাকে বারবার চেষ্টা করতে অনুপ্রাণিত করত। সেই চেষ্টার ফল ধীরে ধীরে তার ফলাফলেও দেখা যায়।
প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণিতে তার রোল ছিল সম্ভবত ৪৯। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৪৮, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৮/২৯, চতুর্থ শ্রেণিতে ১৬ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৫/৬। ষষ্ঠ শ্রেণিতে মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে। সপ্তম শ্রেণিতে রোল ১ হয় তার। অষ্টম শ্রেণিতেও রোল ১ ছিল। তবে ওই সময় মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ থাকায় শুধু ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলেন। নবম শ্রেণিতে রোল ২/৩ এবং দশম শ্রেণিতে আবারও রোল ১ অর্জন করেন।
২০০৮ সালে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পান তাইজুল। তার দাবি, ওই মাদ্রাসার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছেন এবং এরপরও সেখানে আর কেউ গোল্ডেন এ প্লাস পাননি।
দাখিলের পর ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেন। ২০১০ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় এ প্লাস পান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিক বিভাগে মাত্র চারজন এ প্লাস পেয়েছিলেন।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে মেধাক্রম ছিল ১৫০০-এর ওপরে। ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় সমালোচনা। তাকে বলা হয়, ‘এই বিষয় পড়ে কী করবে।’ তবে সমালোচনাকে নিজের জেদের কারণ বানান তাইজুল। বাড়ি না ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ওঠেন। হলের বড় ভাইদের কাছ থেকে শুনেছিলেন, দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে কেউ ভালো বিষয় পায় না। সেই কথার পরই দ্বিতীয়বার পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। মামাও তাকে শর্ত দিয়েছিলেন, ভালো বিষয় পেলে ল্যাপটপ কিনে দেবেন।
এরপর ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিভাগে ভর্তি হই। ২/৩ বছর ভালো গেছে তারপর ডাক্তারের পেছনে দৌড়াদৌড়ি।
জীবনের ট্রাজেডির কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ২/৩ বছরের সময় পা ভেঙে যায়, সাড়ে ৪/৫ বছর বয়সে বাবা মারা যান। এরপ জীবনে নেমে দারিদ্রের কষাঘাত। হাটতে শুরু করেছিলাম দেরিতে ৫ বছর বয়সে। এরপরপরই চোখের সমস্যা দেখা দেয়। ৭ম শ্রেণিতে পড়ার সময় পায়ে প্রকট সমস্যা দেখা দেয়। ৮ম শ্রেনির প্রথম দিকে পা অপারেশন করি, প্রায় ৪/৫ মাস বসে থাকতে হয়। এতে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। ৯ম শ্রেণিতে লাঠিতে ভর দিয়ে মাদ্রাসার যেতে হয়েছে। আজও তার প্রভাব রয়েছে পায়ে, পুরাপুরি ঠিক হয়নি।
২০১৫ সালে অসুস্থতা নিয়ে অনার্স শেষ করি। কিন্তু ২০১৬ সালে পুরো কিডনি ড্যামেজ হয়ে যায়। তখন পড়াশোনা বাদ নিজের বঁচার চিন্তা ছিল প্রথম। তখন আমার আইন বিভাগের আমার প্রিয় শিক্ষকদের এবং আমার বন্ধু-বান্ধবদের ও আইনের বিভাগের সকলে সহযোগিতা, নাম না জানা অনেকে সাহায্য সহযোগিতায় ২০১৭ সালে আমার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ২০১৯ সালে আমি মাস্টার্স শেষ করি
তারপর আমার পড়াশোনায় ফিরতে সময় লাগে। তারপর আবার শুরু হয় ‘করোনা’। একবার পড়াশোনা টেবিল থেকে চলে যাওয়ার পর আবার পুরোদমে পড়াশোনা করতে পারছিলাম না। আমার ব্রেন আর আগের মতো কাজ করছে না। কিন্তু আমার জন্য কিডনি প্রতিস্থাপনের পর পোস্ট কেয়ারে নিয়ম মেনে ভালোভবে পড়াশোনা সম্ভব করা হচ্ছে না। এর পরও আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি চাকরির জন্য কিন্তু সব কিছু এক করে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। বেশিরভাগ সময়ই বিজেএস পরীক্ষা ও বিসিএসের প্রিলিমানারি পরীক্ষা একই সময়ে থাকায় প্রিলিতে পাস করতাম কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় ফেল করতাম। এত ধকল আমার শরীরে কুলাতো না। তাই বার বার ব্যর্থ হয়েছি। ব্যাংকের প্রিলিতে পাস করতাম, কিন্তু রিটেন ফেল। অবশেষে বারের সনদ পেলাম। সে অনেক কথা।
তিনি আরও লেখেন, প্রতি মাসে চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বাবদ তার ৮-১০ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। এ কারণে একজন সিনিয়র আইনজীবীর কাছে আদালতে প্র্যাকটিস করার ইচ্ছার কথা জানালে তিনি নিরুৎসাহিত করেন।
জুডিশিয়ারির পরীক্ষার ক্ষেত্রেও শারীরিক চ্যালেঞ্জ ছিল জানিয়ে তিনি লেখেন, ১০টি লিখিত পরীক্ষা দিতে হয়, যার মাঝে কোনো বিরতি থাকে না। আমার শরীরে কুলায় না, তারপরও চেষ্টা করছি। কিন্ত বার বার ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু হাল ছেড়ে দেইনি। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা আমার মুখের দিকে তাকালেন।