দিনে শ্রম, রাতে পড়াশোনা—অভাবকে জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবদুল মন্নান
অভাব-অনটন, অসুস্থতা ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থামিয়ে রাখেননি আবদুল মন্নান। জীবিকার তাগিদে কখনো রাজমিস্ত্রির সহযোগী, কখনো সুপারশপকর্মী, আবার কখনো স্টেশনারি ও লাইব্রেরির দোকানে কাজ করেছেন তিনি। দিনমজুরি, কৃষিকাজ, কোকারিজে শ্রম এবং টিউশনি করেও চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা।
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় সফল হয়ে বর্তমানে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পড়ছেন মন্নান। তাঁর এই অর্জন কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প নয়; বরং দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস -ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফল।
দিনে শ্রম, রাতে পড়াশোনা
আবদুল মন্নানের বেড়ে ওঠা ছিল নানা সংকটের মধ্যে। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। মা গৃহিণী হওয়ায় পরিবারের ব্যয়ভার সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো খাবারের অভাব দেখা দিলেও পড়াশোনা থামাননি তিনি।
ইন্টারমিডিয়েটের দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালে গ্রামে টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের খরচেও সহায়তা করতেন। রমজান মাসে কসমেটিকসের দোকানে কাজ করেছেন। শহরে কোচিংয়ে ভর্তি হলেও নিয়মিত ক্লাস করার সুযোগ হয়নি। কাজ করে থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাড় করতে গিয়ে পড়াশোনার সময় বের করাই ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তবু দিনের শ্রম আর রাতের পড়াশোনার সমন্বয়ে এগিয়ে গেছেন মন্নান।
ফলাফলে সাফল্য
২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩৩ এবং ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.১৭ অর্জন করেন তিনি। এরপর গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় সফল হয়ে রাবিপ্রবির ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ভর্তি হন।
বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মানিক দে বলেন, মন্নান খুবই পরিশ্রমী ছেলে। পড়াশোনার খরচ জোগানোর জন্য তাকে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে হয়েছে। অন্য শিক্ষার্থীদের মতো সুযোগ-সুবিধা না পেলেও কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সে আজকের এই সফলতা অর্জন করেছে। এতে আমরা আনন্দিত।
অসুস্থতাকেও হার মানিয়েছেন
দীর্ঘদিন ধরে সাইনোসাইটিস, লিভারের সমস্যা ও মাথাব্যথায় ভুগছেন আবদুল মন্নান। অসুস্থতার কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হলেও তিনি হাল ছাড়েননি।
মন্নান বলেন, অনেক কষ্ট আর অভাবের গল্প পেরিয়ে অবশেষে আমি রাবিপ্রবিতে ভর্তি হয়েছি। এটি শুধু একটি ভর্তি নয়, বরং আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সংগ্রামের ফল।
তিনি আরও বলেন, পথটা সহজ ছিল না—প্রতিটি ধাপে ছিল বাধা, কান্না আর হতাশা। তবুও হাল ছাড়িনি। নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করিয়েছি। আব্বুর পরিশ্রম, আম্মুর দোয়া ও গাইডলাইন, বন্ধু এবং এলাকাবাসীর সহায়তা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও গাইডলাইনের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে চান মন্নান। তিনি বলেন, আমি আমার সামনের জীবনটা সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুযায়ী চালাতে এবং প্রতিটি ধাপ আরও সুন্দরভাবে সাজাতে চাই। আবদুল মন্নানের গল্প প্রমাণ করে, সুযোগের সীমাবদ্ধতা স্বপ্নের শেষ নয়। প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।