০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:২৮

জুডিশিয়ারি রেজাল্টের পরও শুনলাম— ‘ওর কীভাবে হলো?’, বাক্যটা শুনতেও ভালো লাগে

ঢাবি শিক্ষার্থী বাকিবিল্লাহ সরল  © টিডিসি সম্পাদিত

স্নাতকের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট না হওয়ায় অ্যাপিয়ার্ড দিয়ে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়ারী সার্ভিস পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে বসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বাকিবিল্লাহ সরল। আর নিজের প্রথম বিজেএসেই করেছেন বাজিমাত! রিটেন পরীক্ষার সপ্তাহখানেক আগে অসুস্থ হয়েও প্রথম প্রচেষ্টায় ১৬৯তম  মেরিট নিয়ে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন সরল। 

তবে এ যাত্রায় আশেপাশের বেশকিছু মানুষের নেতিবাচক কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। তাতে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে সিভিল জজ হওয়া পর্যন্ত মেধার স্বাক্ষর রাখলেও প্রতিবার তাকে শুনতে হয়েছে ‘ওর কেমনে হলো / ও কীভাবে পেলো?’ তবে সিভিল জজ হয়ে নিজেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সরল।

মেধাবী হলেও ‘তথাকথিত পড়ুয়া’ না হওয়ায় আশেপাশের অনেকেই তাকে নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করতেন। এ বিষয়ে সরল জানান, ‎আমার লাইফের সবচেয়ে বেশি শোনা বাক্য হলো ‘ওর কেমনে হলো / ও কীভাবে পেলো?’

‎‎১। বগুড়া জিলা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৬ষ্ঠ হই। অনেককেই বলতে শুনেছি ‘এই ছেলের কেমনে হলো?’
‎২। জিলা স্কুলে থাকাকালীন ক্লাস সেভেনে আমার রোল ছিল ১৪। কোচিংয়ের একজন আমাকে বলছিল কসম করে বল তোর রোল আসলেই ১৪? 
‎৩। অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে মেধাতালিকায় ৯ম হয়ে স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। আমার অনেক সহপাঠী ভ্রু কুঁচকে বলেছিল ‘ও কেমনে বৃত্তি পায়?’ একজন এতটাই অবিশ্বাস করেছিলো যে আমাকে দিয়ে স্কলারশিপ ইংরেজিতে বানান করিয়েছিলো সবার সামনে। 
‎৪। এসএসসি তে স্কলারশিপ পাইছিলাম। অনেককে বলতে শুনেছি ‘ও কীভাবে পেলো?’
‎৫। যদিও এইচএসসি দেই নি তবে সেখানেও স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। 
‎৬। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ১১১তম হয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হই। সেই একই প্রশ্ন ‘ওর কীভাবে হলো?’
‎৭। ১৮শ জুডিশিয়ারির সার্কুলার হওয়ার ও বেশ পরে আমি পড়া শুরু করি। প্রিলি পাস করার পর শুনতে হয়েছে ‘সরল কীভাবে পাস করলো?’ অনেকে নাকি মেনে নিতেই পারছিলো না। 

তিনি আরও জানান,‎ ‘সর্বশেষ জুডিশিয়ারির রেজাল্ট দেয়ার পর শুনলাম আমার কিছু ক্লাসমেট এবং পরিচিত অপরিচিত অনেকেই বলছে ‘ওর কীভাবে হলো?’ ‎আমি আসলে এই বাক্যের সাথে খুবই পরিচিত। খুবই কমন আমার লাইফে। আমি শুনতেও খুব পছন্দ করি। ‎এই বাক্যের এতবার শোনার একটাই কারণ, আমি তথাকথিত নার্ড না। বইয়ে মুখ গুঁজে সারাদিন বসে থাকা আমাকে দিয়ে হয় না। আমি উড়ি, আমি ঘুরি, আমি মুক্ত পাখির মতো বাঁচি। কিন্তু যখন প্রয়োজন তখন ঠিকই পড়ার টেবিলে ফিরে আসি। এই জুডিশিয়ারি জার্নির মাঝেও আমি অনেকগুলো বিয়ের শ্যুট করেছি।’
‎
তার মতে,‎ ‘সুপার থার্টি’ মুভি তে আনন্দ কুমার একটা কথা বলেন ‘যখন সময় আসবে তখন সবচেয়ে উঁচু লাফটা যেনো আমারই হয়’। আমিও এতেই বিশ্বাসী। ভালো করার জন্য সারাবছর সারাদিন রাত পড়ালেখা করতে হয় না। সঠিক সময়ে পড়ালেখা ইনাফ। ‎মানুষ সবসময় আপনার বাহ্যিক অবস্থাটুকুই দেখে, আপনার ত্যাগ, পরিশ্রম কখনো দেখে না। তাই তাদের সব কিছুই অলৌকিক মনে হয়। এলএলবি তে আমার সিজি ৩.২১। অ্যাভারেজ। আমি কখনো চাইনি আমি ডিপার্টমেন্টে টপ করবো। আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল আমি জুডিশিয়ারি দিবো। যখন সময় আসছে আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। ইভেন ঈদে পর্যন্ত আমি বাড়ি যাই নি। জীবনের প্রথম ঈদ পার করেছি বাবা মা কে ছেড়ে। ডে ওয়ান থেকে প্রায় প্রতিদিন ৮-১৪ ঘণ্টা আমি স্টপওয়াচ দিয়ে পড়াশুনা করে গেছি। শেষে রিটেনের ৭ দিন আগে আমার অবস্থা এমন হলো আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম, আমার মেমোরি ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেলো। ডাক্তার কনসাল্ট করতে গিয়ে ডাক্তার সব শুনে বলছিলেন ‘আপনি আর একটা ওয়ার্ড ও পড়বেন না।’ এরপরে ঘুমের ওষুধ, ভিটামিন অন্যান্য মেডিসিন নিয়ে রিটেন এক্সাম অ্যাটেন্ড করি।’
‎
তিনি আরও জানান, ‘‎জুডিশিয়ারিতে আমার মেরিট পজিশন ১৬৯। একটু পেছনের দিকে। এর কারণ আমাকে সিভিলে প্রায় ৩০ মার্ক ফাঁকা রেখে আসতে হয়েছে। আমার কাছের বন্ধু, বড় ভাইরা জানেন কেনো ৩০ মার্ক না লিখে আসতে হয়েছে। লিখতে পারলে হয়তো আরও ১৫-২০ মার্ক বেশি থাকতো। পজিশন আরও এগিয়ে থাকতো। ম্যাথ ও করেছিলাম ৫ টা কারণ আমি ম্যাথে দুর্বল। ‎যাই হোক আলহামদুলিল্লাহ সৃষ্টিকর্তা করুণা করে আমাকে যে পজিশন দিয়েছেন আমি তাতেই তার প্রতি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ ‘

তার পরামর্শ, ‘‎সবশেষে এটাই বলবো, অন্যের পেছনে না লেগে নিজের দিকে ফোকাস করলে সৃষ্টিকর্তা দ্রুত সফলতা এনে দিবেন। শুভকামনা রইলো।’