শিক্ষাজীবনে কখনও সেকেন্ড হননি, বিসিএস ক্যাডার দুই বোনের পর বিচারক হলেন মাহিয়া মারইয়াম
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী মাহিয়া মারইয়াম। প্রথমবার বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েই সারাদেশে ৫০তম স্থান অর্জন করে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি।
প্রথমবার অংশ নিয়েই বিজেএসে ৫০তম স্থান অর্জনের অনুভূতি জানতে চাইলে মাহিয়া মারইয়াম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়! আমি রেজাল্ট পাওয়ার পর কান্না করতে করতে শেষ হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতেই অনেক সময় লেগেছে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল আমি মহান আল্লাহর কাছে যা চেয়েছি, তিনি আমাকে ঠিক সেটাই দিয়েছেন। আল্লাহর দরবারে নিজের চাওয়া কবুল হওয়ার এই আনন্দ বিজেএসে টেকার আনন্দের থেকেও অনেক বেশি। আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি ধারণার বাইরে দয়াবান।’
সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার বাসা পটুয়াখালী সদরে। আমরা তিন বোন, যার মধ্যে আমি সবার ছোট। আমার বড় দুই বোনই বিসিএস ক্যাডার। আমাদের তিন বোনের এই সাফল্যের পেছনে আল্লাহর পর পৃথিবীতে আমার আম্মা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। আম্মা ছাড়া আমরা আসলে কিছুই না! বিশেষ করে মানসিক সমর্থনের দিক থেকে তিনি আমাকে যেভাবে আগলে রেখেছেন, তা বলার বাইরে।’
দুই বড় বোনের অবদানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন মাহিয়া। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমার দুই বড় বোনই বিসিএস ক্যাডার, তারা আমার সেরা পরামর্শক হিসেবে পাশে ছিলেন। এই পথচলায় তাদের অনেক বড় ভূমিকা ছিল।’
আরও পড়ুন: এক বছরে তিন চাকরি, দিনে মাত্র ২-৩ ঘণ্টা পড়ার সুযোগ পেয়েই জজ তানিয়া
নিজের শিক্ষাজীবন সম্পর্কে মাহিয়া জানান, তার পড়াশোনার পুরোটা কেটেছে পটুয়াখালীতে। পটুয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং পটুয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। আমি স্কুল, কলেজ এবং বরিশাল বোর্ডে এসএসসি ও এইচএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলাম। ক্লাসেও সবসময় ফার্স্ট গার্ল ছিলাম।’
ফার্স্ট গার্ল হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞান বিভাগে না গিয়ে মানবিক বিভাগ বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য। মাহিয়া বলেন, ‘ফার্স্ট গার্ল হওয়া সত্ত্বেও সায়েন্স না নিয়ে মানবিক বিভাগ বেছে নেওয়ার কারণ ছিল একটাই ঢাবির আইন বিভাগে পড়ার স্বপ্ন।’ পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশে ১১তম স্থান অর্জন করে আইন বিভাগে ভর্তি হন মাহিয়া। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা ছিল তার।
প্রস্তুতি সম্পর্কে মাহিয়া বলেন, ১৮তম বিজেএসই ছিল তার জীবনের প্রথম বিজেএস পরীক্ষা। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই এলএলএম (মাস্টার্স) করছেন। আমি অনার্স লাইফে বিজেএস নিয়ে আলাদা পড়াশোনা করিনি। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করার পর মূলত বিজেএসের পড়াশোনা শুরু করি।’
বিজেএসের প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সুবিশাল সিলেবাসের কথা উল্লেখ করেন মাহিয়া। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বাধা ছিল বিজেএসের সুবিশাল সিলেবাস! অনার্স শেষ করার পর হুট করে চোখের সামনে এত বড় সিলেবাস দেখে শুরুতেই অনেক কষ্টকর লাগত।’
আরও পড়ুন: ‘আমি বাঁচতে চাই’— আকুতি করা দুঃখিনী মায়ের সেই তাইজুল এখন জজ
তবে কঠিন সিলেবাস দেখে থেমে যাননি তিনি। অধ্যবসায় ধরে রেখে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। মাহিয়া বলেন, ‘আমি হাল না ছেড়ে পারসিভারেন্স বা অধ্যবসায় বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। প্রতিদিন নিয়ম করে আট থেকে নয় ঘণ্টা পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেই কঠোর পরিশ্রমেরই ফল পেয়েছি।’
প্রথমবার বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৫০তম স্থান অর্জন করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত মাহিয়া মারইয়ামের সাফল্যের গল্পে তাই রয়েছে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, পরিবারের অনুপ্রেরণা, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যপূরণের জন্য নিয়মিত পরিশ্রমের সমন্বয়।