২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:১১

হাটে শাক-সবজি বিক্রি করা ছেলেটা আজ সিভিল জজ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আইন বিভাগের ২০১৪–১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. শামীম আহমেদ।  © টিডিসি ফটো

কখনো হাটে শাক-সবজি, ডিম ও দুধ বিক্রি করতেন। বন্ধুদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘ব্যবসায়ী’ নামে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় স্কুল ফাঁকি দেওয়ার অভ্যাসও ছিল। সেই ছেলেটিই এখন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) ১৮তম পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৭২তম হয়ে সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

তিনি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার চান্দেরচর গ্রামের সন্তান এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আইন বিভাগের ২০১৪–১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. শামীম আহমেদ।

শামীমের বিচারক হওয়ার পথটি অবশ্য সহজ ছিল না। কৃষক বাবা মো. জামির হোসেন ও গৃহিণী মা ছুরিয়া বেগমের সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। পরিবারের কৃষিকাজে সহযোগিতার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন কৃষিপণ্য হাটে নিয়ে বিক্রি করতেন তিনি। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি পরিবারের গুরুত্ব তাঁকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নেয়।

স্কুল ফাঁকি দেওয়া থেকে মেধাতালিকায়
শামীমের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল অনিয়মিত। প্রাথমিকের প্রথম কয়েক বছর পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী ছিলেন না। মা স্কুলে পৌঁছে দিলেও সুযোগ পেলেই পালিয়ে যেতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে এসে শিক্ষকদের পরিচর্যায় তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

এরপর বদলে যেতে থাকে তাঁর শিক্ষাজীবন। ২০০৬ সালে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন। অষ্টম শ্রেণিতেও একই বৃত্তি পান। পরে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন।

বিচারক হওয়ার স্বপ্নটি অবশ্য শুরু থেকেই তাঁর নিজের ছিল না। ছোটবেলায় মা তাঁকে প্রায়ই বলতেন, ‘তোমাকে বড় ম্যাজিস্ট্রেট হতে হবে।’ মায়ের সেই কথাই একসময় নিজের স্বপ্নে পরিণত হয়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর লক্ষ্য আরও দৃঢ় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে এক বিচারক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে শামীম বলেছিলেন, ‘আমি দেশের প্রধান বিচারপতি হতে চাই।’

টিউশনি করে প্রস্তুতি, দুইবার ব্যর্থতা
২০১৯ সালে এলএল.বি. (অনার্স) সম্পন্ন করার পর বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন শামীম। প্রস্তুতির পাশাপাশি নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করতেন। সীমিত সময় ও আর্থিক সংকটের মধ্যেই চলেছে তাঁর প্রস্তুতি।

আইনের বিভিন্ন বিষয় মুখস্থ করার পাশাপাশি তিনি বেয়ার অ্যাক্ট, গুরুত্বপূর্ণ নজির, উচ্চ আদালতের রায় এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, পরীক্ষায় ভালো করতে হলে শুধু পড়ার সময় বাড়ালেই হবে না; পড়ার মানও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রথম দুই প্রচেষ্টায় চূড়ান্ত সাফল্য আসেনি। দুইবার মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি তিনি।
এই ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং কোথায় ঘাটতি ছিল তা চিহ্নিত করে নতুন করে প্রস্তুতি নেন। অবশেষে তৃতীয় প্রচেষ্টায় আসে সাফল্য। ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৭২তম হয়ে সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

‘এই সাফল্য শুধু আমার নয়’
নিজের এই অর্জনের পেছনে মা-বাবার অবদানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন শামীম। তাঁর ভাষ্য, আর্থিক সংকটের মধ্যেও বাবা-মা কখনো তাঁর পড়াশোনায় আপস করেননি। শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা, শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা এবং সহধর্মিণীর সমর্থনও তাঁর পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শামীম মনে করেন, একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে শুধু তাঁর নিজের পরিশ্রম থাকে না; পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং কাছের মানুষের বিশ্বাসও সমানভাবে কাজ করে।

বিচারক হিসেবে তাঁর লক্ষ্য আইন ও ন্যায়ের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করা। কোনো ভয়, পক্ষপাত বা প্রভাব যেন বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে, এমন প্রত্যয় তাঁর।

তরুণদের উদ্দেশে শামীম বলেন, আর্থিক সংকট, গ্রামীণ পরিবেশ কিংবা একাধিকবার ব্যর্থতা কোনো কিছুই স্বপ্ন পূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা নয়। নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।