২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭

ইরাসমাস মুন্ডাসের পর এবার যুক্তরাজ্যে ফুলফান্ডেড স্কলারশিপ পেলেন পাবিপ্রবির তানভীর

পাবিপ্রবি শিক্ষার্থী তানভীর সৈকত   © সংগৃহীত

স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার, লক্ষ্য ছিল গবেষণার মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রাখা। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে বড় অর্জন এসেছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইসিই) বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর সৈকতের জীবনে। যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা University of Sheffield-এ সম্পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

তানভীর সৈকত Engineering and Physical Sciences Research Council (EPSRC)-এর Doctoral Landscape Award (DLA)-এর পূর্ণাঙ্গ অর্থায়ন পেয়েছেন। এই বৃত্তির আওতায় তিনি যুক্তরাজ্যের University of Sheffield-এ Doctor of Philosophy (PhD) ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ পাবেন।

শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়টি যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ Russell Group-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের একটি এবং ঐতিহ্যবাহী ‘red-brick’ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। তানভীরের ভাষ্য অনুযায়ী, QS World University Rankings-এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান বিশ্বে ৮২তম এবং QS Sustainability Rankings-এ ৩৩তম।

শেফিল্ডে তানভীর সৈকত School of Mathematical and Physical Sciences-এ গবেষণা করবেন। তাঁর গবেষণার বিষয় perovskite materials for sustainable solar-energy conversion। পেরোভস্কাইটভিত্তিক উপাদান ব্যবহার করে সৌরশক্তিকে আরও কার্যকর ও টেকসইভাবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর গবেষণা ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করবে।

তবে শেফিল্ডে পিএইচডির সুযোগ পাওয়ার আগেও তানভীরের সামনে খুলে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার একাধিক দরজা। যুক্তরাজ্যের University of Southampton থেকেও তিনি পিএইচডির অফার পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিও Russell Group-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত।

এছাড়া তানভীর সৈকত FAMEAIS Erasmus Mundus Joint Master's Programme-এর জন্যও পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি লাভ করেছিলেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পরিচালিত Erasmus Mundus-এর এই সুযোগ তাঁর আন্তর্জাতিক একাডেমিক যাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

শুধু যুক্তরাজ্য বা ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও এসেছে তাঁর জন্য স্বীকৃতি। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করার পরিকল্পনা ছিল না তাঁর। কারণ তিনি GRE পরীক্ষা দেননি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে তেমন গবেষণাও করেননি। তবে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহে তিনি শেষ পর্যন্ত আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে তিনি কেবল এমন প্রোগ্রামগুলোতেই আবেদন করেন, যেখানে সম্পূর্ণ আবেদন ফি মওকুফের সুযোগ ছিল। সেই আবেদন থেকেই পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য আংশিক বৃত্তির প্রস্তাব পান তিনি।

তালিকায় ছিল Johns Hopkins University, Brown University, Boston University, Illinois Institute of Technology, University of Florida এবং Tulane University। এর মধ্যে Brown University আইভি লিগের অন্যতম সদস্য।

তানভীরের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার গল্প। উচ্চশিক্ষার আবেদন প্রক্রিয়ার দিনগুলোতে যেমন ছিল প্রত্যাশা, তেমনি ছিল ফলাফল নিয়ে উৎকণ্ঠা। কখনো দীর্ঘ অপেক্ষা, কখনো ঘুমহীন রাত, আবার কখনো নিজের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন জেগেছে তাঁর মনে।

তবে সবকিছুর পরও তিনি বিশ্বাস রেখেছেন সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনায়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তানভীর বলেন, অনেক সময় মানুষ একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে যায় যে, জীবনের জন্য অন্য কোন পথও যে নির্ধারিত থাকতে পারে, তা ভুলে যায়। তাঁর ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন সুযোগের মধ্য দিয়ে একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে।

পাবিপ্রবির ইইসিই বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে যাত্রা শুরু করে যুক্তরাজ্যের University of Sheffield-এ পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নে পিএইচডির সুযোগ পাওয়া তানভীর সৈকতের এই অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার। বিশেষ করে প্রকৌশল ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর পথচলা দেখিয়ে দেয় সঠিক প্রস্তুতি, অধ্যবসায়, গবেষণার প্রতি আগ্রহ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর মানসিকতা থাকলে দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে নিজের জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।

সৌরশক্তি ও টেকসই জ্বালানি নিয়ে তানভীরের ভবিষ্যৎ গবেষণা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত একাডেমিক অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের একজন তরুণ গবেষকের আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে পদচারণারও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নতুন এই যাত্রায় তাঁর গবেষণা পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নয়নে কতটা অবদান রাখে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।