২৪ আগস্ট ২০২৬, ২২:২৪

ক্লাবিং, চাকরি, গবেষণা—সাকিবের অর্জনের ঝুলিতে এখন ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার

ক্লাবিং, চাকরি, গবেষণা—সাকিবের অর্জনের ঝুলিতে এখন ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার  © সংগৃহীত

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন অনেক শিক্ষার্থীর থাকে। সেই স্বপ্ন পূরণে যদি বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায় তাহলে খুশির সীমা থাকে না। কোনটা ছেড়ে কোনটায় পড়বে তা নিয়ে তা তৈরি হতে পারে দোটানা।

অনুপ্রেরণার উদাহরণ গড়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ৪৪তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী সাকিব আল মুনতাসির। ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পাস করেন ৩.৬১ সিজিপিএ নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটাতেন পড়াশোনা, ক্লাব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। নেতৃত্বের গুণাবলির জন্য দায়িত্ব পালন করেন বুটেক্স বিজনেস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রোগ্রাম, প্রতিযোগিতা, সেমিনার, ওয়ার্কশপে ব্যস্ত থাকার পর প্রবেশ করেন চাকরি জীবনে। আর সম্প্রতি পেলেন দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ। ভিন্নভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন পিএইচডিতে অধ্যয়নের সুযোগ আর আটটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্সের। 

নিজের গবেষণার আগ্রহ ও দর্শনের সাথে সামঞ্জস্য, ধর্মীয় নিয়ম কানুন ও সামাজিক মূল্যবোধ মেনে চলার সর্বোচ্চ পরিবেশ, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বিবেচনায় সৌদি আরবের কিং ফাহদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস (কেএফইউপিএম) বেছে নিয়েছেন তিনি। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৬৩তম। ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডির জন্য সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি পেয়েছেন তিনি। বৃত্তির আওতায় রয়েছে পড়াশোনার খরচ, আবাসন, রাউন্ড ট্রিপ, ভ্রমণ ও চিকিৎসার সুবিধা। পিএইচডির জন্য তিনি আরও সুযোগ পান যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনে।

মাস্টার্স পর্যায়ে তাঁর পাওয়া আটটি সুযোগের মধ্যে রয়েছে- সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব বোরাসে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ইনোভেশন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলেন ইউনিভার্সিটিতে ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়াতে ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলয়ে সাসটেইনেবল ইঞ্জিনিয়ারিং, কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে সাসটেইনেবল ফ্যাশন এবং হেরিয়ট-ওয়াট ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাশন অ্যান্ড টেক্সটাইলস ম্যানেজমেন্ট। 

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটি থেকে নির্দিষ্ট অংকের মার্কিন ডলারের বৃত্তি আবার কোনোটি থেকে গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ-এর মাধ্যমে আর্থিক সুবিধার সুযোগ পান তিনি। 

বিদেশে উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে থাকলেও সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সেমিস্টারে। সাধারণত স্নাতকের পর স্নাতকোত্তর, এরপর পিএইচডি— উচ্চশিক্ষার এই প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে স্নাতক শেষ করে সরাসরি পিএইচডির সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা, অ্যাকাডেমিক প্রকাশনা এবং পেশাগত দক্ষতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

উচ্চশিক্ষার এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁর আবেদনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল মাঠ পর্যায়ের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা। তিনি রিড কনসাল্টেন্সি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠানে সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড সার্কুলারিটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। উক্ত কর্মস্থলে থাকাকালীন সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডের হয়ে দেশের ভেতর ও বাইরে পঞ্চাশটির বেশি টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার উন্নতিকরণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনপত্র সমৃদ্ধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সাহায্য করেছে।

তাঁর ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে ক্লাবিং ও নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে। স্নাতক জীবনের শেষভাগে বুটেক্স বিজনেস ক্লাবের সভাপতি এবং ২০২৪ সালে বুটেক্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে ‘হেড অব ভলান্টিয়ার্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ দশটিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংগঠনে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত মানুষের সঙ্গে মেশা, কঠিন পরিস্থিতি সামলানো এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ার দক্ষতা তাঁকে স্কলারশিপের চূড়ান্ত ভাইভা বোর্ডেও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

উচ্চশিক্ষার আবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আইইএলটিএস পরীক্ষায় রয়েছে তার ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ফুল টাইম চাকরির কারণে নিয়মিত প্রস্তুতির সময় বের করতে পারছিলেন না। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে পাওয়া এক সপ্তাহের কম ছুটিকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন তিনি। কোনো কোচিং বা কারো তত্ত্বাবধান ছাড়া পরীক্ষা দিয়ে অর্জন করেন ৭.৫ স্কোর। 

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় থেকে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করার ব্যাপারে জানতে চাইলে সাকিব আল মুনতাসির জানান, টেক্সটাইল নিয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে বৃত্তির সুযোগ সীমিত, তাই অনেকে পলিমার সায়েন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স বা ডিজাইন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুযোগ খোঁজেন। আমার ক্ষেত্রে কিং ফাহদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-এর গবেষণা ক্ষেত্র মিলে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশ্বমানের গবেষণাগার থাকা, বৈশ্বিক অবস্থান এবং সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে পড়াশোনার সুযোগ বড় ভূমিকা রাখে।

আন্তর্জাতিক বৃত্তিতে আবেদন করতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও ধারাবাহিকতা। আইইএলটিএস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল-এর উপর ভরসা না করে অ্যাকাডেমিক, পেশাগত ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয়ে নিজের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা বাড়াতে হবে। 

ভবিষ্যতে দেশে ফিরে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি একটি গবেষণা কমিউনিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। যেখানে শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায় থেকে গবেষণায় যুক্ত হওয়া, গবেষণাপত্র লেখা ও নিজেদের গবেষণা অভিজ্ঞতা গড়ে তোলার বিষয়ে সহযোগিতা করবেন। এখন নিজের অ্যাকাডেমিক ও গবেষণার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে মনোযোগী তিনি।