১৮ জুলাই ২০২৬, ২২:৩২

বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই এডমিন ক্যাডার হন কুয়েটের নাজমুল

নাজমুল হাসান  © টিডিসি ফটো

দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ৬৩তম স্থান অর্জন করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান।

সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নাজমুল হাসান বলেন, এটা এমন এক অনুভূতি, যা লিখে শেষ করা যাবে না। জীবনের একটি বড় লক্ষ্য ছুঁতে পেরেছি। এজন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।

জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার বাউসি গ্রামে তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। পাশাপাশি পড়াশোনাতেও ছিলেন মনোযোগী। পরিবার পরিজনের স্নেহ ও ভালোবাসার মধ্যেই কেটেছে তাঁর শৈশব।

শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিক সাফল্যের নজির রয়েছে নাজমুলের। সরিষাবাড়ী রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি, দুই পরীক্ষাতেই অর্জন করেন জিপিএ-৫। এরপর ভর্তি হন কুয়েটের ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তিনি মনে করেন, কুয়েটে ভর্তি হওয়াটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার সময় থেকেই তার কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা তৈরি হয়, যার চূড়ান্ত ফল আজকের এই সাফল্য।

সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি বাবা-মায়ের অবদানের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি প্রতিটি পদক্ষেপে পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর সহধর্মিণীর প্রতি।

বিসিএস প্রস্তুতিতে তিনি কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। নিয়মিত স্টপওয়াচ ব্যবহার করে পড়ার সময় হিসাব রাখা, প্রতি সপ্তাহে নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ভয় কাটাতে নিয়মিত মক টেস্ট দেওয়া, ইংরেজি দক্ষতা বাড়াতে অনুবাদচর্চা এবং দেশ বিদেশের চলমান বিষয় সম্পর্কে নিজেকে আপডেট রাখা। এসব কৌশল তাঁকে এগিয়ে রেখেছে বলে জানান তিনি।

প্রস্তুতির সময়টাকে নাজমুল হাসান বর্ণনা করেন উত্থান পতনের দীর্ঘ যাত্রা হিসেবে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া তাঁর বিসিএস প্রস্তুতির পথচলায় এসেছে নানা চ্যালেঞ্জ ও হতাশা। প্রথম ভাইভা দেন ২০২৫ সালের মার্চে। একই বছরের অক্টোবরে চাকরিতে যোগ দিলেও বিসিএসের স্বপ্ন পূরণ হয় ২০২৬ সালের জুনে। তাঁর মতে, জীবনে যত সমস্যাই আসুক, নিজেকে মানসিকভাবে শক্ত রাখতে হবে এবং কোনোভাবেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।

মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই তরুণের পরিবারে রয়েছেন বাবা-মা, ছোট ভাই এবং তাঁর সহধর্মিণী। পরিবারের সমর্থন ও দোয়া তাঁকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।

ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রে নিজের পছন্দ ও বাবার স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন নাজমুল। চ্যালেঞ্জিং কাজের প্রতি আগ্রহ থেকেই প্রশাসন ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ হিসেবে রেখেছিলেন। এছাড়াও তার বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে একদিন এসিল্যান্ড হবে। সেই স্বপ্ন এবং মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থেকেই প্রশাসন ক্যাডারকে প্রথম পছন্দে রেখেছিলেন। 

ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আগ্রহ, কর্মপরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন নাজমুল হাসান। তাঁর মতে, যারা চ্যালেঞ্জিং ও মাঠপর্যায়ের কাজ করতে আগ্রহী এবং ছুটির দিনেও দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত, তারা প্রশাসন, পুলিশ, অডিট, কাস্টমস কিংবা ট্যাক্স ক্যাডারকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ছুটির সুবিধাকে গুরুত্ব দিলে ট্যাক্স, কাস্টমস ও অডিট ক্যাডার উপযুক্ত হতে পারে। এছাড়া যাদের নির্দিষ্ট কর্মস্থল, বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মজীবনের প্রতি আগ্রহ রয়েছে, তারা নিজেদের পছন্দ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ক্যাডার তালিকা সাজাতে পারেন। তবে ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রে অন্যদের অনুসরণ না করে নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

ভবিষ্যৎ বিসিএস প্রত্যাশীদের জন্য তাঁর পরামর্শ: অন্যকে দেখে নয়, নিজের লক্ষ্য ও আগ্রহ বিবেচনা করে বিসিএসের পথে আসতে হবে। সবাই বিসিএস দিচ্ছে বলে আমিও দেব এমন মানসিকতা নিয়ে এ পথে আসা উচিত নয়। তার মতে কেন বিসিএস দিতে চান, এই প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেই কেবল এই লম্বা জার্নির হতাশা কাটিয়ে সফলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তিনি মনে করেন, বিসিএসে সফল হওয়ার অন্যতম চাবিকাঠি হলো, ধৈর্যশক্তি, প্রচুর পরিশ্রম করার মানসিকতা, জেদ এবং নিজস্ব কৌশল।

চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিসিএসকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিলে অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক চাকরিতেও সফল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। জীবনে সবসময় বড় লক্ষ্য নির্ধারণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, লক্ষ্য ছোট হলে অনেক সময় সেই লক্ষ্যেও পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর নিজের জীবনেও বিসিএসে সফল হওয়ার আগে সোনালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গেজেট হওয়ার পর যে উদ্দেশ্য নিয়ে চাকরিতে যোগ দেব, তা যেন পূরণ করতে পারি। মানুষের পাশে থেকে তাদের জন্য কিছু করতে চাই। এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।