মায়ের স্বপ্ন পূরণে পিএইচডি সম্পন্ন, ড. শাকিলের ব্যতিক্রমী পথচলা
সময়টা তখন নব্বইয়ের দশক। ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজিতে (বর্তমানে বুটেক্স) চার বছর মেয়াদি বিএসসি ডিগ্রি প্রদান করা হতো। তখন ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষার বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সাংগঠনিক কার্যক্রমের পরিসরও ছিল সীমিত। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন উদ্যমী শিক্ষার্থীর সাথে মিলে একটি বিতর্ক ক্লাব গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন ২৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাকিল ফয়জুল্লাহ্। তখন ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে সেই ক্লাব একসময় আয়োজন করে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা, যা তখনকার সময়ে টেক্সটাইল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ছিল এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
তবে এই নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস আর সাংগঠনিক দক্ষতা শাকিলের মাঝে একদিনে গড়ে উঠেনি। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তার নেতৃত্বে দল বিজয়ী হয় এবং তিনি শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হন। বিতর্কের পাশাপাশি থিয়েটারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ক্লাসরুমের বাইরে এসব কার্যক্রম তার চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেছে। এবিষয়ে শাকিল ফয়জুল্লাহ্ বলেন, ‘শুধু পড়াশোনা করলে মানুষের চিন্তা অনেক সময় একদিকে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। সহশিক্ষা কার্যক্রম মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।’
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়া শেষ করে বের হওয়ার আগেই তিনি সংবাদমাধ্যম বিবিসির সাথে কাজ শুরু করেন। সংবাদমাধ্যমের জগৎ তাকে নতুন এক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। মানুষের গল্প, সমাজের পরিবর্তন ও উন্নয়নের পথের বাঁধা এসব বিষয় তাকে ক্রমশ আকৃষ্ট করতে থাকে। স্নাতক শেষে ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যের গোল্ডস্মিথস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর পিএইচডি শুরু করার সুযোগ এলেও মায়ের গুরুতর অসুস্থতার কারণে তাকে দেশে ফিরে আসতে হয় এবং ২০১৯ সালে মায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর পাশে ছিলেন।
এছাড়া তিনি ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতিসংঘের ইউএন রেসিডেন্ট কোর্ডিনেটরস অফিসে কমিউনিকেশনস অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরে ইউএনডিপি বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ইউনিসেফ বাংলাদেশে কমিউনিকেশনস স্পেশালিস্ট হিসেবে যোগ দিয়ে মিডিয়া রিলেশন্স ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। ২০১৬ সালের জুনে তিনি ইউনিসেফ বাংলাদেশের কমিউনিকেশন ম্যানেজার পদে উন্নীত হোন। পরবর্তীতে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ইউনিসেফ সাপ্লাই ডিভিশনের কমিউনিকেশনস স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার পর, মায়ের অপূর্ণ ইচ্ছাকে পূরণ করতে ২০২৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে পাড়ি জমান। ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার গ্র্যাডি কলেজ অব জার্নালিজম অ্যান্ড মাস কমিউনিকেশনে থেকে ইতোমধ্যেই তিনি এডভার্টাইজিং অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি গবেষণা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত আছেন। চলতি বছরের আগস্ট মাস থেকে তিনি টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করবেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার মূল আগ্রহ ছিল প্রযুক্তিগতভাবে বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে।
পিএইচডি সম্পন্ন করার অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, গত মার্চ মাসে যেদিন আমি সফলভাবে পিএইচডি ডিফেন্স সম্পন্ন করলাম, সেদিন আমি খুব গভীরভাবে অনুভব করেছি এই অর্জন শুধু আমার না। এটা আমার মায়ের, যার নিজের পড়াশোনার পথ থেমে গিয়েছিল, কিন্তু শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস কোনো দিন থামেনি। এটা আমার বাবার, যিনি বছরের পর বছর সেই স্বপ্নের পাশে অবিচল ছিলেন। তারা চলে যাওয়ার পর আমি এখনও তাদের কবরের কাছে যাইনি। অনেক দিন আমি মেনে নিতে পারিনি যে তারা আর নেই। আর যেদিন তাদের কবরের সামনে দাঁড়াব, আমি বলবো আমি তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করেছি। এই পিএইচডিতে আমার নাম আছে মাত্র। কিন্তু এর গল্প শুরু হয়েছে আমার মাকে দিয়ে। আর এর শক্তি এসেছে আমার বাবা-মা দু’জনের ভালোবাসা, ত্যাগ আর বিশ্বাস থেকে।
টেক্সটাইলে পড়াশুনা করে ভিন্ন পেশা নির্ধারণ করতে চাওয়া তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো পেশা বেছে নেওয়ার আগে মানুষের উচিত নিজের কাছে পরিষ্কার হওয়া আসলে সে কী করতে চায় এবং কেন করতে চায়। আমাদের দেশে অনেক সময় মানুষ শুধু চাকরি বা আয়ের কথা ভেবে পেশা নির্বাচন করে। কিন্তু যে কাজটি করতে আনন্দ পাওয়া যায়, দীর্ঘমেয়াদে সফলতাও সেখানেই আসে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সব সময় নিজের আগ্রহকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ মানুষ যদি প্যাশন নিয়ে কাজ করে, তাহলে সাফল্য একদিন না একদিন তার কাছে নিজেই ধরা দেয় বলে আমি বিশ্বাস করি।