১২ জুলাই ২০২৬, ১২:৩১

‘আব্বু, তোমার ছেলে তো ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গেছে’—প্রশাসন ক্যাডার হয়েই বাবাকে ফোন জাওয়াদুলের

জাওয়াদুল আলম  © সংগৃহীত

একজন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর সাফল্যের পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ, সংগ্রাম এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন। ৪৭তম বিসিএসের ফল প্রকাশের সেই আবেগঘন মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আব্বুকে ফোন করে বলেছিলাম, ‘আব্বু, তোমার ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গেছে।’

৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী জাওয়াদুল আলম। দীর্ঘ প্রস্তুতি, নানা চ্যালেঞ্জ ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত তার সাফল্যের অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প তুলে ধরেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের কাছে।

ফল প্রকাশের মুহূর্তটির কথা স্মরণ করতে গিয়ে জাওয়াদুল আলম বলেন, আছরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাচ্ছিলাম। ফল প্রকাশের সম্ভাবনা থাকায় মোবাইল সঙ্গে ছিল। মসজিদে ঢোকার ঠিক আগে ফল প্রকাশ হয়। রোল নম্বর দেখে কয়েক মুহূর্ত বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছিল। আল্লাহর অশেষ রহমত ছাড়া মানুষের যত যোগ্যতাই থাকুক না কেন ৩,৭৪,৭৪৭ জন চাকরিপ্রার্থীর মধ্য থেকে প্রশাসন ক্যাডারের মাত্র ২০০টি আসনের একটিতে নিজের রোল নম্বর খুঁজে পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়।

জাওয়াদুলের শৈশব কেটেছে নড়াইলের কালিয়ায়। বাবার চাকরির সুবাদে সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে উন্নত পড়াশোনার জন্য মা, বড় ভাই ও তাকে নিয়ে পরিবার খুলনায় চলে আসে। তবে পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার বাবা দীর্ঘদিন একা থেকেছেন। সপ্তাহে একবার বাড়ি আসতেন, আর তার মায়ের রান্না করে দেওয়া খাবার ফ্রিজে রেখে সপ্তাহজুড়ে খেতেন। আজ সফলতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাবার সেই ত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

শিক্ষাজীবনে জাওয়াদুল ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী। পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় থানায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেছেন খুলনা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে। এরপর কুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন এবং ২০২২ সালে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি সম্পন্ন করেন।

স্নাতক শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া নাকি দেশে থেকে অন্য কোনো পথ বেছে নেওয়া এ নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন তিনি। পরে পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিসিএসকে লক্ষ্য করে পূর্ণোদ্যমে প্রস্তুতি শুরু করেন।

তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রস্তুতির শুরুতেই এক ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন জাওয়াদুল। প্রায় ৪০টি সেলাই, সংক্রমণ, একাধিক অস্ত্রোপচার এবং তিন মাসের বেড রেস্ট—সব মিলিয়ে তখন তিনি মনে করেছিলেন বিসিএসের স্বপ্ন বুঝি শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সেই সময় বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গবেষণাপত্র প্রকাশের কাজের পাশাপাশি বিসিএস প্রস্তুতিও চলছিল। দুর্ঘটনার কারণে মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেললেও তিনি থেমে যাননি। ক্রাচে ভর দিয়ে কোচিংয়ে যেতেন, নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এর ফলও পান দ্রুত। প্রথম বিসিএসেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং টেকনিক্যাল ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তবে ৪৬তম বিসিএসে সাধারণ ক্যাডার হাতছাড়া হলেও ৪৭তম বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

নিজের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান পরিবারের বলে মনে করেন তিনি। বিশেষভাবে উল্লেখ করেন বাবা-মা ও সহধর্মিণীর কথা। বিসিএসের দীর্ঘ প্রস্তুতির সময় পরিবারের কেউ তাকে চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেননি। বরং সময়, ধৈর্য ও মানসিক সমর্থন দিয়ে পাশে থেকেছেন। এমনকি বেকার অবস্থায়ও সহধর্মিণী ও তার পরিবার আস্থা রেখে পাশে দাঁড়িয়েছেন। সকলের সমর্থন তাকে ঠান্ডা মাথায় বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছে। 

আরও পড়ুন: জার্মানির স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে বিসিএস জয় যবিপ্রবির সিফাতের

প্রস্তুতির কৌশল সম্পর্কে জাওয়াদুলের বিশ্বাস, বিসিএসে সফলতার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো ধারাবাহিকতা। তিনি বলেন, মেধা ও পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ, তবে ধারাবাহিকতা ছাড়া এগুলোর পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায় না।

ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী হওয়ায় গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান তুলনামূলক সহজ ছিল তার কাছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিকে তিনি আগ্রহের জায়গায় পরিণত করেছিলেন। চাকরির পরীক্ষার জন্য পড়ার চেয়ে শেখার আনন্দ নিয়েই বিষয়গুলো আয়ত্ত করার চেষ্টা করেছেন।

ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রেও সচেতন ছিলেন জাওয়াদুল। তিনি মনে করেন, শুধু অন্যের পছন্দ অনুসরণ না করে নিজের ব্যক্তিত্ব, আগ্রহ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যাডার নির্বাচন করা উচিত। প্রত্যেক ক্যাডারের কাজের ধরন ও বাস্তবতা সম্পর্কে জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, প্রস্তুতির শুরু থেকেই নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার মতো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়গুলোতে দীর্ঘমেয়াদি চর্চা এবং ধৈর্য ধরে লেগে থাকার মানসিকতা থাকতে হবে। তিনি বলেন, মেধার চেয়ে ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত বেশি পার্থক্য গড়ে দেয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জাওয়াদুল আলম বলেন, আমার বাবা সবসময় দোয়া করতেন, যেন এমন একটি ক্যাডার পাই যেখানে মানুষের সবচেয়ে বেশি সেবা করার সুযোগ থাকে। আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করেছেন। এখন আমার লক্ষ্য সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য কাজ করা।