প্রথম বিসিএসেই এএসপি মোস্তফা কে মুরাদ, বললেন— বিসিএস সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ‘হতাশা’
ব্যাংকের ৯টা-৫টার ব্যস্ত চাকরি, সংসার ও সামাজিক দায়িত্ব—সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে এক অনন্য কীর্তি গড়েছেন গাইবান্ধার সন্তান মোস্তফা কে মুরাদ আহমেদ। ৪৭তম বিসিএসের মতো একটি তুলনামূলক কঠিন পরীক্ষায় প্রথমবার অংশ নিয়েই পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
মেধা তালিকায় দেশজুড়ে তার অবস্থান ৪২তম। ২০১৫ সালে এসএসসিতে জিপিএ ৫ এবং পরবর্তীতে এইচএসসিতে ৪.৪২ পেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও দমে যাননি তিনি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) এ সাবেক শিক্ষার্থীর শূন্য থেকে বিসিএস শীর্ষ ক্যাডার হওয়ার সেই অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছেলে মোস্তফা কে মুরাদের শৈশব কেটেছে গ্রামীণ পরিবেশে। নব্বই দশকের শেষ প্রজন্মের অন্যসব শিশুর মতোই কাদা-মাটি আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি। ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। পরে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.৪২ পেলেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে।
মোস্তফা কে মুরাদ আহমেদ ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি নিয়েছেন বিসিএস প্রস্তুতি। তিনি বলেন, বিসিএসে সফল হওয়ার আগে থেকেই আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মরত ছিলাম। পূর্ণকালীন ব্যাংকিং চাকরির ব্যস্ততার মধ্যে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া ছিল আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, সারাদিন অফিসের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়েও প্রতিদিন পড়ার টেবিলে বসতে হতো। তবে এই কঠিন পথ কিছুটা সহজ করে দিয়েছিলেন তার সহকর্মীরা। আইএফআইসি ব্যাংকের সহকর্মীরা প্রস্তুতির বিষয়টি উপলব্ধি করে কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।
আরও পড়ুন: শিক্ষা, প্রশাসনের পর এবার পররাষ্ট্র ক্যাডার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসান
সময়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে মোস্তফা বলেন, ‘ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিদিন অন্তত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পড়াশোনার চেষ্টা করতেন। অনেক সময় এর চেয়েও বেশি সময় দিতেন।’ তবে তার ক্ষেত্রে ছুটির দিনগুলোও খুব একটা পড়ার সুযোগ এনে দিত না। কর্মদিবসে অফিসের কারণে পরিবারকে সময় দিতে না পারায় সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য ছুটির দিনগুলো কেটে যেত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনেই।
প্রস্তুতির সময়ে দুই কার্যকর কৌশল অনুসরণের কথা জানিয়ে তিনি জানান, প্রথমত, কোনো বিষয় পড়া শুরু করার আগে সেই বিষয়ের ওপর ডেমো পরীক্ষা দিতেন। এর মাধ্যমে নিজের দুর্বলতা ও শক্তির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনা অনুযায়ী পড়াশোনা করতেন। পরে আবার একই বিষয়ের পরীক্ষা দিয়ে নিজের অগ্রগতি যাচাই করতেন। এতে নেগেটিভ মার্কিং কাটিয়ে ওঠাও সহজ হয়েছে বলে জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, তিনি বেশি বই বা তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে সীমিত বিষয় নির্বাচন করে বারবার রিভিশন দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, অল্প বিষয় বারবার পড়া দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।
সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের সবচেয়ে বড় ভূমিকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার সাফল্যের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিবার। বিশেষ করে বিয়ের পর পড়াশোনা ও সংসার একসঙ্গে সামলাতে আমার স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যাতে মোস্তফা নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা করতে পারেন।
এ ছাড়া বাবা-মা এবং স্ত্রীর সঙ্গে কাটানো সময়ই তাকে মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান তিনি। বিসিএস প্রত্যাশীদের জন্য পরামর্শ জানিয়ে তিনি বলেন, বিসিএসের দীর্ঘ প্রস্তুতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আমি মনে করি হতাশাকে। এই যাত্রায় ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
পুলিশ ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্যকে অনুসরণ না করে নিজের আগ্রহ ও লক্ষ্য অনুযায়ী ক্যাডার নির্বাচন করা উচিত। ক্যাডার চয়েস দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ক্যাডারের কাজের ধরন, সুবিধা-অসুবিধা, চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, পদায়ন, ছুটি এবং পদোন্নতির নিয়ম সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।