বউয়ের ভালোবাসায় বিসিএসের স্বপ্ন জয় করিমের
জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিসিএস ক্যাডারের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুল করিম। সংসার, চাকরি ও সন্তান সামলে ৪৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। তার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন সহধর্মিণী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম স্নাতক শেষ করার পরই বিয়ে করেন। পরে এক কন্যাসন্তানের বাবা হন। সে সময় অনেকেই মনে করেছিলেন, সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর হয়ত তার ক্যারিয়ারের পথ থমকে যাবে। তবে সব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে নিজের স্বপ্নের পথেই এগিয়ে গেছেন তিনি।
তবে এ পথ মোটেও সহজ ছিল না। শুরুতে টিউশনি করে স্ত্রী-সন্তানের খরচ চালাতেন। একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দুইয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে। পরে একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। চাকরি, সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে করতেই দিনের অধিকাংশ সময় কেটে যেত।
এরপরও ক্লান্ত শরীরে রাত জেগে বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন তিনি। একসময় যেকোনো মূল্যে স্বপ্ন পূরণের সংকল্পই হয়ে ওঠে তার এগিয়ে চলার শক্তি। শুরুর দিকে ব্যর্থতার মুখোমুখি হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। নিরন্তর চেষ্টার ফল হিসেবে কয়েকটি সরকারি চাকরিতে সুযোগ পান। পরে একটি সরকারি ব্যাংকে যোগ দেন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও বিসিএসের প্রস্তুতি থামাননি।
৪৫তম বিসিএসে তিনি নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তবে ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন তখনও অটুট ছিল। সরকারি ব্যাংকের চাকরি, সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তিনি নীরবে প্রস্তুতি চালিয়ে যান। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নিবিড় প্রস্তুতিই শেষ পর্যন্ত এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে কষ্ট করে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন এবং শেষ পর্যন্ত ৪৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
আরও পড়ুন: ৬ বিষয়ে ব্যাকলগ, সিজিপিএ ২.৪৫—সেই সৈকত এখন প্রশাসন ক্যাডার
নিজের সাফল্যের বিষয়ে আব্দুল করিম বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো একটানা লেগে থাকা। জীবনে যত বাধাই আসুক, লেগে থাকতে পারলে একসময় সফলতা আসবেই এটাই ছিল আমার মূলমন্ত্র। অজুহাত দিতে চাইলে অনেক অজুহাতই দেওয়া যায়। একটি অজুহাত আরেকটি অজুহাতকে সামনে এনে মানুষের মনোবল নষ্ট করে দেয়। আমি সেটাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমার সহধর্মিণী আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। সন্তানের মুখের দিকে তাকালেও মনে হতো, ওকে একজন বিসিএস ক্যাডারের মেয়ে হিসেবে পরিচিত করতে চাই। সব মিলিয়ে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকুই করে গেছি।
আব্দুল করিমের স্ত্রী ইয়াসমিন রুনু একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। স্বামীর এমন সাফল্যে তিনি বলেন, চাকরির কারণে আমিও ব্যস্ত থাকতাম। তারপরও করিম সন্তানকে সামলে নিজের পড়াশোনা ও চাকরি দুটোই চালিয়ে গেছে। নিরলস পরিশ্রম করেছে। জীবনে অনেক সমস্যা এসেছে, কিন্তু সে কখনো থেমে যায়নি। সামনে সে আরও ভালো করবে এটাই আমার প্রত্যাশা।
আব্দুল করিমের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তার স্বজন ও এলাকাবাসী। তারা জানান, সংসার, চাকরি ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের লক্ষ্য অর্জন কীভাবে সম্ভব তার অনন্য উদাহরণ আব্দুল করিম।