৬ বিষয়ে ব্যাকলগ, সিজিপিএ ২.৪৫—সেই সৈকত এখন প্রশাসন ক্যাডার
অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে একসঙ্গে ছয়টি বিষয়ে ব্যাকলগ। সিজিপিএ মাত্র ২.৪৫। অনেকেই যেখানে এমন ফলের পর স্বপ্ন গুটিয়ে নেন, সেখানে ভোলার নাজমুল আবেদীন সৈকত সেদিনই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিসিএস ক্যাডার হবেন। দীর্ঘ পরিকল্পিত প্রস্তুতি, নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম, পরিবারে অবিচল সমর্থন এবং নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের ফল হিসেবে অবশেষে ৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি।
নাজমুল আবেদীন সৈকতের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম উকিলপাড়ায়। বাবা আলহাজ ডা. মো. নাসির উদ্দিন একজন চিকিৎসক এবং মা নার্গিস বেগম গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট সৈকত।ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও সমান আগ্রহ ছিল তার। শৈশব কেটেছে ভোলার পরিচিত পরিবেশেই।
শিক্ষাজীবনের শুরু আদর্শ একাডেমিতে। পরে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি দুই পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরবর্তীতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
৪৬তম বিসিএস ছিল তার প্রথম বিসিএস। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তবে ব্যর্থতাকে হতাশা নয়, শিক্ষার সুযোগ হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘প্রিলিমিনারির প্রশ্নপত্রটি আমি সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম। বারবার প্রশ্নগুলো দেখে নিজের ভুল বিশ্লেষণ করেছি, কোথায় দুর্বলতা ছিল তা খুঁজে বের করেছি এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছি। এরপর মহান আল্লাহর রহমতে ২০২৫ সাল থেকে প্রায় সব চাকরির পরীক্ষাতেই সফল হতে শুরু করি।’
নিজের বিসিএস যাত্রার কথা বলতে গিয়ে সৈকত বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই পরিকল্পনা করে এগোতে চেয়েছি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ঢাকায় থেকে প্রস্তুতি নেব। এমন একটি মেসে উঠেছিলাম, যেখানে সবাই বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং লক্ষ্য নিয়ে খুবই সিরিয়াস ছিল। আমি এমন পরিবেশে থাকতে চেয়েছিলাম, যেখানে লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ কম থাকবে।’
তিনি জানান, প্রস্তুতির প্রথম ছয় মাসকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। এ সময় বাংলা সাহিত্য, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ প্রিলিমিনারি ও লিখিত—দুই পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিভিন্ন বই ও অনলাইন থেকে সংগ্রহ করে নিজের ভাষায় বিস্তারিত নোট তৈরি করেন।
সৈকত বলেন, ‘শুরুর ছয় মাসেই প্রস্তুতির ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। পরে নানা কারণে আগের মতো উদ্যম থাকে না। তাই শুরুতেই শক্ত ভিত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’
৪৬তম বিসিএস ছিল তার প্রথম বিসিএস। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তবে ব্যর্থতাকে হতাশা নয়, শিক্ষার সুযোগ হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘প্রিলিমিনারির প্রশ্নপত্রটি আমি সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম। বারবার প্রশ্নগুলো দেখে নিজের ভুল বিশ্লেষণ করেছি, কোথায় দুর্বলতা ছিল তা খুঁজে বের করেছি এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছি। এরপর মহান আল্লাহর রহমতে ২০২৫ সাল থেকে প্রায় সব চাকরির পরীক্ষাতেই সফল হতে শুরু করি।’
বর্তমানে নাজমুল আবেদীন সৈকত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত।চাকরির পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েই তিনি বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেছেন। প্রস্তুতির কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রিলি ও লিখিত দুটো পরীক্ষার জন্য উপযোগী একটি সমন্বিত নোট তৈরি করেছিলাম। নিয়মিত পড়াশোনার এই ধারাবাহিকতাই আমাকে এগিয়ে রেখেছে।’
সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সৈকত বলেন, ‘আমার নিজের চেয়ে বাবা-মায়ের আনন্দই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ফল প্রকাশের পর আনন্দে তারা টানা দুই রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। তাঁদের মুখের হাসিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
প্রস্তুতির কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষার জন্য কাজে লাগে এমন বিষয়গুলোর একটি সমন্বিত নোট তৈরি করেছিলাম। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা হলেও নিয়মিত পড়াশোনা করেছি। এই ধারাবাহিকতাই আমাকে এগিয়ে রেখেছে।’
পরিবারের অবদানের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সফলতায় আমার চেয়ে পরিবারের অবদান বেশি। বাবা-মা ছোটবেলা থেকেই আমাদের জন্য অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। প্রস্তুতির সময় আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তে তারা পাশে ছিলেন। বাবা নিয়মিত পত্রিকা পড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমার সঙ্গে আলোচনা করতেন। আমার বোন, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সহযোগিতাও কখনো ভোলার নয়।’
ক্যাডার চয়েজ প্রসঙ্গে সৈকত বলেন, ‘আমার প্রথম পছন্দ ছিল প্রশাসন, দ্বিতীয় পছন্দ পুলিশ। ক্যাডার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আগ্রহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা উচিত।’
আরও পড়ুন: ঢাবিতে কীভাবে অনার্স ভর্তি বন্ধ করা যায়, ভাবতে হবে
বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, ‘সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত দুই থেকে তিন বছর চেষ্টা করলে সফল হওয়া সম্ভব। তবে বিসিএসই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। এক-দুই বছর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা যেতে পারে, এরপর পাশাপাশি অন্য চাকরির প্রস্তুতিও রাখা উচিত। কারণ স্বপ্নের চেয়ে জীবন বড়।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে সৈকত বলেন, ‘দেশের যেখানেই দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাই, মানুষের সেবা করাই হবে আমার মূল লক্ষ্য। এমনভাবে কাজ করতে চাই, যাতে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।’
নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে সৈকত বলেন, ‘অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে আমার ছয়টি বিষয়ে ব্যাকলগ ছিল, সিজিপিএ ছিল মাত্র ২.৪৫। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। এরপর কঠোর পরিশ্রম করে সব ব্যাকলগ শেষ করে সিজিপিএ ৩-এর ওপরে নিয়ে আসি। আজ প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। ব্যাকলগ থেকে প্রশাসন ক্যাডারের এই পথচলা সহজ ছিল না, কিন্তু প্রিয়জনদের দোয়া ও মহান আল্লাহর রহমতে তা সম্ভব হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।’
মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করে তিনি বলেন, ‘দেওয়ার মালিক মহান আল্লাহ। আমাদের দায়িত্ব শুধু পরিকল্পনা করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাওয়া। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পরিশ্রম করলে অসম্ভবও একদিন সম্ভব হয়ে যায়।’
নাজমুল আবেদীন সৈকতের এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক, স্বজন, বন্ধু ও ভোলার মানুষের মধ্যে আনন্দের আমেজ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সততা, দক্ষতা ও মানবিকতা দিয়ে তিনি প্রশাসন ক্যাডারের একজন আদর্শ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং দেশের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।