২৯ জুন ২০২৬, ১৯:৫৩

৭ বছরের চেষ্টা, অ্যাডমিন ক্যাডার হলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল মতিন

আব্দুল মতিন  © টিডিসি সম্পাদিত

একের পর এক ব্যর্থতা, হতাশা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষা—তবুও স্বপ্ন থেকে একচুলও সরে যাননি আব্দুল মতিন। ব্যর্থতাকে পরিণত করেছেন নতুন করে শুরু করার শক্তিতে। প্রায় সাত বছরের নিরলস অধ্যবসায়, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে প্রস্তুতি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিদান হিসেবে অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে অ্যাডমিন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী। স্বপ্নপূরণের এই দীর্ঘ পথচলায় ছিল অসংখ্য চ্যালেঞ্জ, ত্যাগ আর সংগ্রামের গল্প। সেই অভিজ্ঞতা, প্রস্তুতির কৌশল, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি— মো. আব্দুল আলিম।

আপনার বেড়ে উঠা ও শিক্ষাজীবন কিভাবে কেটেছে?
আব্দুল মতিন : আমার বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার শিলিন্দা গ্রামে। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু শিলিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর বসুয়া উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল ক্যাম্পাস হাই স্কুল ও সরকারি সিটি কলেজে পড়াশোনা করি। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজশাহী কলেজের রসায়ন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করি। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি। 

রাজশাহী কলেজ আপনার জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে?
আব্দুল মতিন : অনেকেই মনে করেন শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই সফল হওয়া যায়। কিন্তু আমার বিশ্বাস, আল্লাহ মানুষকে যেখানে রাখেন, সেখানেই ভালো কিছু করার সুযোগ তৈরি করে দেন। রাজশাহী কলেজ আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। এখানকার শিক্ষকদের আন্তরিকতা, দিকনির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণাই আমাকে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

বিসিএসের প্রস্তুতি কবে থেকে শুরু করেছিলেন?
আব্দুল মতিন : ২০১৯ সালের শেষ দিকে প্রস্তুতি শুরু করি। তবে ২০২২ সাল থেকে পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকি। আমি কখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে পড়তে পারিনি। যখনই সময় পেয়েছি, বই পড়েছি, নতুন কিছু জানার চেষ্টা করেছি। শুধু মুখস্থ নয়, বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করেছি।

বিসিএস পরীক্ষায় কতবার অংশ নিয়েছেন?
আব্দুল মতিন : ৪৪তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতেই বাদ পড়ি। ৪৫তম বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত গিয়েও চূড়ান্ত সুপারিশ পাইনি। বিশেষ বিসিএসেও সফল হতে পারিনি। এরপর ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসে অংশ নিই। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে সফলতা দিয়েছেন।

বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যখন টিকছিলেন না, তখন কি মনে হয়েছিল, আর সম্ভব নয়? 
আব্দুল মতিন : অনেকবার, বিশেষ করে ৪৫তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আমি ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হয়েছিল হয়তো আমার দ্বারা আর হবে না। এমনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যদি এবারও না হয় তাহলে আর ভাইভা দেব না। কিন্তু পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের অনুপ্রেরণা এবং আল্লাহর ওপর ভরসাই আমাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।

সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবরটি কীভাবে জানলেন?
আব্দুল মতিন : সেদিন কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। এর আগে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস-এ দেখেছিলাম, সেদিনই ফল প্রকাশ হতে পারে। আসরের আজানের সময় বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও সংবাদমাধ্যমে ফল প্রকাশের খবর আসতে শুরু করে। নামাজে যাওয়ার আগে বড় ভাইকে বলেছিলাম, ফল বের হলে যেন বাসায় জানিয়ে দেন। আমি নামাজ শেষে ফিরে জানতে পারি, আমি প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। খবরটি শোনার পর পরিবারের সবাই আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন। সেই মুহূর্তটি আজও আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতি। 

এই সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কার?
আব্দুল মতিন : প্রথমেই আমার বাবা-মায়ের কথা বলব। বাবা বছরের পর বছর সাইকেলে করে আমাকে কোচিং ও পড়াশোনার জন্য নিয়ে গেছেন। মা সবসময় সাহস ও দোয়া দিয়েছেন। এ ছাড়া আমার শিক্ষক, বন্ধু, স্ত্রী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা সবসময় পাশে ছিলেন। এই অর্জন আমি তাদের সবার প্রতি উৎসর্গ করছি। 

চাকরির পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া কতটা কঠিন ছিল?
আব্দুল মতিন :খুব কঠিন ছিল। আমার কর্মস্থল ছিল দুর্গম চরাঞ্চলে। যাতায়াতের কষ্ট ছিল সীমাহীন। অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকত না, তখন মোমবাতির আলোয় পড়েছি। ছুটির দিনগুলো লাইব্রেরিতে কাটিয়েছি। বাসায় বসে টানা পড়ার অভ্যাস আমার কখনো ছিল না। সুযোগ পেলেই লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়তাম।

চাকরিকালে আপনার পরিকল্পনা কী?
আব্দুল মতিন : জনগণের সেবা করাই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। চরাঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুধু সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে প্রশাসনের মাধ্যমে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।

বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
আব্দুল মতিন : সময়কে মূল্য দিতে হবে। মোবাইল-ফোন অপচয়ের জন্য নয়, শেখার জন্য ব্যবহার করতে হবে। শুধু বই নয়, চারপাশের সবকিছু থেকেই শেখার চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

সফলতার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি কী বলে মনে করেন?
আব্দুল মতিন : ধৈর্য, আমি মনে করি, সফলতার সবচেয়ে বড় সূত্র হলো ধৈর্য আর পরিশ্রম। মানুষ পরিশ্রম করে, কিন্তু দ্রুত ফল না পেলে হতাশ হয়ে যায়। এটা করা যাবে না। যারা পরিশ্রম করেন আল্লাহ তা’য়ালা কখনো তাদের নিরাশ করেন না। 

আপনার জীবনে এমন কোনো মানুষ আছেন, যিনি আপনাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন?
আব্দুল মতিন : অনেকেই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। বিশেষ করে লাইব্রেরিতে এক বড় ভাই কাবির ভাইকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়তে দেখতাম। তাকে দেখে ভাবতাম, আমি যদি তারমতো এতটা মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারতাম! অন্যের সফলতায় ঈর্ষা নয়, বরং তাদের পরিশ্রম থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা?
আব্দুল মতিন : একটাই কথা পড়াশোনা, ধৈর্য ও পরিশ্রম করতে হবে। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। আজ না হোক, কাল আল্লাহ তা’য়ালা অবশ্যই পরিশ্রমের প্রতিদান দেবেন। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, পরিবারকে মূল্য দিতে হবে এবং কখনো হাল ছাড়া যাবে না।

সময় দেওয়ায় আপনাকে ধন্যবাদ
আব্দুল মতিন : ধন্যবাদ।