দেশের ৭ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও সুযোগ হয়নি, আসিফ এখন পড়ছেন হার্ভার্ডে
একসময় দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কোনো সুযোগ না পাওয়ার পরও থেমে যাননি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার তরুণ আসিফ মোক্তাদির। অধ্যবসায়, সংগ্রাম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির পথ ধরে সেই ব্যর্থতার গল্পই একসময় তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ডে। সম্প্রতি তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের (জনস্বাস্থ্য নীতি এমপিএইচ) ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। একই সঙ্গে আইভি লীগভুক্ত কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ভর্তি অফার অর্জন করেছেন তিনি।
১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া আসিফের শৈশব কেটেছে মৌলভীবাজারে। ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থতার সময়টি ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
পরবর্তীতে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান আসিফ। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা ছিল কঠিন। জীবনের শুরুতে একটি কফি শপে কাজ করতে হয়েছে তাকে। দিনের পরিশ্রম শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন ঘরে ফিরে দেখতেন, বন্ধুদের দেশে পড়াশোনা করছে, তখন অনেক সময় মায়ের বুকে মাথা রেখে কান্না করতেন। এভাবেই কেটেছে তার সংগ্রামের দিনগুলো।
তবে স্বপ্ন হারাননি। যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক সম্পন্ন করার পর মাস্টার্স অব সায়েন্স ইন ফিজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েট স্টাডিজ ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে একজন চিকিৎসাসেবাকর্মী (চিকিৎসা সহকারী) হিসেবে কর্মরত।
চিকিৎসা পেশায় কাজ করতে গিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছেন অভিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সংগ্রাম। ভাষাগত বাধা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং জটিল স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক মানুষকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে। এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন শুধু রোগী দেখা নয়, স্বাস্থ্যনীতি পর্যায়ে কাজ করে বড় পরিসরে পরিবর্তন আনা। সেই লক্ষ্যেই আবেদন করেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং অর্জন করেন হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ বলেন, জীবনের একসময় মনে হয়েছিল সব শেষ। কিন্তু এখন বুঝি ব্যর্থতা কখনো শেষ নয়, বরং নতুন পথের শুরু। চার বছর আগে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ঘুরতে গিয়ে জন হার্ভার্ডের স্মৃতিফলকের সামনে দাঁড়িয়ে এই ছবিটা তুলেছিলাম। তখন শুধু বিস্ময়ে চারপাশটা দেখছিলাম। তখন কখনো কল্পনাও করিনি যে একদিন আমিও এই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবো। এই খবরটা এখনো আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগে।”
তিনি আরও বলেন, হার্ভার্ডে যে কয়েকজন বাংলাদেশি পড়েছেন বা এখনও পড়ছেন, আমি তাদের মধ্যে একজন এ ভাবতেও অন্যরকম লাগে। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।
ভবিষ্যতে আসিফ স্বাস্থ্যনীতি ও জনস্বাস্থ্য খাতে কাজ করে অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আরও ন্যায়সঙ্গত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করাও তার অন্যতম স্বপ্ন।
প্রসঙ্গত, সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস কর্পস (এনএইচএসসি) স্কলারশিপ এবং মাদার ক্যাব্রিনি ফাউন্ডেশনের ৫০ হাজার ডলারের স্কলারশিপ অর্জন করেছেন।