বিসিএসের ফল জালিয়াতি করতে চুক্তিভিত্তিক দলীয় ‘সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) তথ্যপ্রযুক্তি কার্যক্রমে পরিবর্তন এনে চুক্তিভিত্তিক দলীয় ব্যক্তিকে ‘সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করে সংগঠনটি। ‘জুলাই সনদের আলোকে পিএসসি সংস্কার, সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা এবং নগ্ন দলীয়করণের প্রতিবাদে’ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি) দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সংগঠনটির অভিযোগ, সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে সরকার। একই সঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদত্যাগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ বলে মনে করছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি বলছে, বিগত সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের কারণে সরকারি নিয়োগব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পিএসসির কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। জুলাই জাতীয় সনদে পিএসসিকে পুনর্গঠন করে সংবিধানের অধীনে তিনটি পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়নে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।
ছাত্রশিবিরের প্রস্তাব অনুযায়ী, তিনটি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন করতে হবে। ওই কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রতিটি কমিশনের জন্য একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। তাঁদের পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দলীয় হস্তক্ষেপমুক্ত পিএসসি গঠনের অঙ্গীকার করার পরও সরকার কেন জুলাই সনদের আলোকে সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু করছে না? নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা কমানো, রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রভাবমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি বন্ধে সরকারের পরিকল্পনা কী?
ছাত্রশিবিরের দাবি, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পিএসসিকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান সময়ে সেসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংগঠনটি আরও জানায়, আগে বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা পরীক্ষকদের বাড়িতে পাঠানো হতো। খাতায় প্রার্থীর রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকায় পরিচয় প্রকাশ এবং মূল্যায়নে অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হতো। এ পদ্ধতিতে ফল প্রকাশে ১৫ থেকে ১৮ মাস সময় লাগত। অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে কোডভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন এবং একই খাতার বিভিন্ন প্রশ্ন একাধিক পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করে। এতে খাতা মূল্যায়নের সময় কমে ৩৫ থেকে ৪০ কর্মদিবসে নেমে আসে বলে দাবি সংগঠনটির।
মৌখিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সংস্কার আনার কথা তুলে ধরে ছাত্রশিবির জানায়, আগে ভাইভায় ২০০ নম্বর বরাদ্দ ছিল। পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে ১০০ করা হয়। পাশাপাশি মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে প্রার্থীর তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা, আচরণ ও বাস্তব কর্মদক্ষতা যাচাইয়ে ‘কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ’ পদ্ধতি চালু করা হয়। এতে মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার মেধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পিএসসির নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন, প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার, উন্নত ওএমআর এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও সংস্কারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, এসব উদ্যোগের ফলে প্রশ্নফাঁস ও ফলাফল জালিয়াতির সুযোগ কমেছে।
এ ছাড়া নিয়োগজট নিরসনে ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি গ্রহণের কথাও উল্লেখ করেছে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির ভাষ্য, আগে একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত নিয়োগের সুপারিশ পর্যন্ত তিন থেকে চার বছর সময় লাগত। মোবাশ্বের মোনেমের কমিশন এ দীর্ঘসূত্রতা কমাতে উদ্যোগ নেয়। এ সময় ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি ৪৭তম ও ৫০তম বিসিএস দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৫০তম বিসিএসের পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া এক বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানায় সংগঠনটি। তবে এসব সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রশিবির। সংগঠনটি জানায়, পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করেন। তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেও কমিশনের স্বায়ত্তশাসন ও সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার মধ্যে তাঁর পদত্যাগের সময় ও পরিস্থিতি জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে দাবি সংগঠনটির। তাদের তথ্য অনুযায়ী, কমিশনের দুই সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমান যথাক্রমে ১৫ ও ১৭ অক্টোবর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর চায়ের আমন্ত্রণের পর তাঁদের পদত্যাগের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইভাবে কমিশনের আরও কয়েকজন সদস্যকে চায়ের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি। ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, অধ্যাপক সোহেল রহমানের পদত্যাগের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডার থেকে পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) এবং তথ্যপ্রযুক্তি শাখায় সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে চুক্তিভিত্তিক দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের সময় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে আশঙ্কা তাদের।
এ বিষয়ে সংগঠনটির বক্তব্য, ‘আমাদের সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা, বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের ক্ষেত্রে লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতেই এখন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি কার্যক্রমে বিতর্কিত ও রহস্যজনক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’ তাদের দাবি, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম জালিয়াতির মাধ্যমে মেধার অবমূল্যায়ন এবং দলীয় অনুগতদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর পরিকল্পনা থেকেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মৌখিক পরীক্ষার নম্বর আবার ১০০ থেকে ২০০ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানতে পেরেছে সংগঠনটি। ছাত্রশিবিরের মতে, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবে অসম্মতির কারণেই অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম পদত্যাগ করেছেন বলে আলোচনা রয়েছে উল্লেখ করে তাঁর পদত্যাগের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সরকারের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করেছে সংগঠনটি।
ছাত্রশিবির জানায়, ৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা গত ২৯ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কোনো ধরনের অনিয়ম, কারসাজি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে হাজারো চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। সংগঠনটির মতে, পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদত্যাগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ, নিয়োগপ্রক্রিয়ার নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে মনে করে ছাত্রশিবির।