০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৩৬

কক্সবাজারে ট্যুরে নিয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্র অধিকার নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে

বামে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা, ডানে ভুক্তভোগী ছাত্র অধিকার নেতা  © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকা কলেজ ছাত্র অধিকার পরিষদের এক নেতাকে কক্সবাজারে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন, অপহরণের চেষ্টা, জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় ও মাদকদ্রব্য দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন জেমিন, আহ্বায়ক সদস্য আরিয়ান ও ইমরান ফকিরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে নিউমার্কেট থানায় অভিযোগপত্র দিয়েছেন ‘ভুক্তভোগী’ নাইমুল হাসান জুবায়ের। তবে তাকে জুবায়েরের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে জানিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেমিন।

নাইমুল হাসান জুবায়ের ঢাকা কলেজ ছাত্র অধিকার পরিষদের ১ নং কার্যকরী সদস্য। তিনি কলেজের দর্শন বিভাগের ২০২৬-১৮৭ সেশনের শিক্ষার্থী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে তিনি ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন এবং নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন।

থানায় দায়েরকৃত অভিযোগপত্রে জেমিন, আরিয়ান ও ইমরান ফকির ছাড়াও নির্যাতনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—ইভান, সোহাগ, জুবায়ের জয়, এখলাস, সাদ হোসেন তামীম, স্বপনীল, সাওয়াদ গোসেন তাহসিন ও মাহফুজ। তারা সবাই ছাত্রদলের কর্মী ও সাজ্জাদ হোসেন জেমিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ছাত্রদল নেতা জেমিনের উদ্যোগে ভুক্তভোগী নাইমুল হাসান জুবায়ের কক্সবাজার ভ্রমণে যান। পরে ৩ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে তাকে ঘুম থেকে তুলে জেমিনের হোটেল কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জেমিনসহ কয়েকজন বহিরাগত তাকে গামছা দিয়ে মুখ ও হাত বেঁধে ছুরি, কাঁচি, বেল্ট, স্ট্যাম্প ও গামছা দিয়ে নির্যাতন করেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তাকে (নাইমুল হাসান জুবায়ের) আটকে রেখে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এ সময় তার ওপর ভোর ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নির্যাতন চালানো হয়।

ভোর আনুমানিক ৪টা থেকে ৫টার দিকে আমাকে ঘুম থেকে তুলে ছাত্রদল নেতা জেমিন ভাইয়ের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। রুমে ঢুকিয়ে আমার সামনে প্লাস্টিকের স্টাম্প, বেল্ট, কাঁচি ও চাকু রাখা হয়। এরপর চতুর্দিক থেকে আমার ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়। চড়-থাপ্পড়, ঘুষি ও লাথি দিয়ে আমার মাথা, মুখ ও পিঠে আঘাত করা হয়— অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী ছাত্র অধিকার পরিষদ নেতা নাইমুল হাসান জুবায়ের

থানায় জুবায়েরের অভিযোগ অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি এবং সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ইয়াবাসহ নেশাজাতীয় দ্রব্যের সঙ্গে তাকে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে ভিডিও ও ছবি ধারণ করা হয় এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয় কুমিল্লার নূরজাহান হোটেল থেকে তিনি পালিয়ে যান। এর আগে তার টাকা, ব্যাগ ও মোবাইল নিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারণে ভবিষ্যতে তার ওপর আরও হামলা বা ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা নাইমুল হাসান জুবায়ের বলেন, ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন জেমিন ভাইয়ের অমন্ত্রণে গত ৩১ সেপ্টেম্বর রাতে আমরা কক্সবাজার ট্যুরে যাই। কিন্তু ট্রেনে ওঠার পর থেকেই ওনার অনুসারী জুনিয়ররা আমার সাথে নানাভাবে মানসিকভাবে হয়রানিমূলক আচরণ করতে থাকে। কক্সবাজারে দুটি পৃথক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। হোটেলে অনৈতিক কাজ ও বিচে একজন ভাসমান নারীর সাথে তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। যার সাথে আমার কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। এসব অনৈতিক ঘটনায় ঘটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য তারা আমাকে দায়ী করে। কিন্তু তখন আমি হোটেলে গভীর ঘুমে ছিলাম।

তিনি বলেন, এরপর ভোর আনুমানিক ৪টা থেকে ৫টার দিকে আমাকে ঘুম থেকে তুলে ছাত্রদল নেতা জেমিন ভাইয়ের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। রুমে ঢুকিয়ে আমার সামনে প্লাস্টিকের স্টাম্প, বেল্ট, কাঁচি ও চাকু রাখা হয়। এরপর চতুর্দিক থেকে আমার ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়। চড়-থাপ্পড়, ঘুষি ও লাথি দিয়ে আমার মাথা, মুখ ও পিঠে আঘাত করা হয়।

আমরা কেউ জানতাম না যে জুবায়ের নামের এই ছেলে ছাত্রলীগের সাথে জড়িত এবং ছাত্রলীগ করে। কক্সবাজার ট্যুরে যাওয়ার পর দুই দিনে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এবং তার সাথে কথা বলে জানতে পারি সে ছাত্রলীগ। একই সাথে সে আমাদের সাথে উদ্ধত আচরণ করে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে আমরা তাকে কলেজের নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করব— অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন জেমিন

জুবায়ের বলেন, এ সময় তারা আমাকে ক্রমাগত জেরা করতে থাকে এবং চাপ দিতে থাকে যেন আমি স্বীকার করি যে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব —জিয়া ভাই, ইমন ইমু, পিয়াল, মিল্লাদ, আল আমিন, শরীফ, তানভীর, শিহাব ও পারভেজের মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের প্ররোচনায় আমি তাদের (জেমিন) ক্ষতি করার পরিকল্পনা করেছি। সেসময় মিথ্যা স্বীকারোক্তি না দিলে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভোর থেকে শুরু করে সকাল ১০টা পর্যন্ত ধাপে ধাপে আমার ওপর নির্যাতন চলে। মারধরের তীব্রতায় আমি অন্তত তিনবার অজ্ঞান হয়ে পড়ি। দুপুরের দিকে আমাকে বাইরে খেতে নিয়ে যাওয়ার সময়ও একজন আমার প্যান্টের বেল্ট ধরে রাখে যাতে আমি পালিয়ে যেতে না পারি। পরবর্তীতে আমাকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে আসার সময় আমি কুমিল্লার নূরজাহান হোটেল থেকে পালিয়ে যাই। আমার টাকা, ব্যাগ ও মোবাইল পূর্বেই নিয়ে নেয় তারা। কক্সবাজারের সী শার্ক হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলে আমার সাথে ঘটা ভয়ঙ্কর প্রমাণ পাবেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন জেমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা কেউ জানতাম না যে জুবায়ের নামের এই ছেলে ছাত্রলীগের সাথে জড়িত এবং ছাত্রলীগ করে। কক্সবাজার ট্যুরে যাওয়ার পর দুই দিনে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এবং তার সাথে কথা বলে জানতে পারি সে ছাত্রলীগ। একই সাথে সে আমাদের সাথে উদ্ধত আচরণ করে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে আমরা তাকে কলেজের নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করব।

তিনি বলেন, সে অনুসারে আমাদের সাথে করে তাকে নিয়ে আসার সময় রাত ৫.২০ মিনিটের সময় কুমিল্লায় হোটেল নুরজাহানে যাত্রা বিরতিকালে ওয়াশরুমে যাওয়া-আসার মধ্যে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া না গেলে হোটেল কর্তৃপক্ষের মাইকে এনাউন্সমেন্ট করে আমরা ২০ মিনিট অপেক্ষা করে চলে আসি। আসার পর জানতে পারি সেই জুবায়ের কলেজের কারো প্ররোচনায় আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং থানায় মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছে। আমাকে এবং আমার সংগঠনকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার কারণে আমি এই মিথ্যা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার দাবি করছি।

নির্যাতন ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ প্রসঙ্গে জেমিন বলেন, আমরা কেউ সেখানে ওকে মারধর করিনি। ও পালিয়ে আসার পর দুই দিন কাদের হেফাজতে ছিল? তারাও তো মারধর করতে পারে। এ ছাড়া নারী ও মাদকের কোন কিছুই সেখানে ঘটেনি। মানুষ অভিযোগ দিলে অনেক কিছুই বলে।

ছাত্রদলে সংগঠন পরিপন্থী কোনো কাজ কেউ করলে বিরুদ্ধে তো আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। সেন্ট্রাল বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সত্যতা পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আন্যায় প্রশ্রয় পাওয়ার কোনো সুযোগ ছাত্রদল নেই— ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন

এদিকে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নাইমুল হাসান জুবায়ের দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি এক সময় লীগ করেছি, এটা অস্বীকার করি না। কিন্তু আমার কোথাও কোনো পদ ছিল না, পদবি ছিল না। আমি মোটামুটি নিষ্ক্রিয় কোনরকম একজন সামান্য কর্মী ছিলাম। আমি শুধু স্বচ্ছ রাজনীতি করেছি। এরপরে আমি ২৩ সালেই রাজনীতি থেকে ইস্তফা দেই। ২৪-এর ১৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে সরে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করি। এসব দেখেই পরবর্তীতে ছাত্র অধিকারে আমাকে নিয়েছে।

তিনি বলেন, আমি যদি ছাত্রলীগ হয়ে থাকি এখনো, তাহলে জেমিন ভাইয়ের সাথে যে টুকটাক সম্পর্ক ছিল, বিশেষ করে নির্বাচনের আগের প্রোগ্রামগুলো করছি, রবি ভাইয়ের (সড়কমন্ত্রী রবিউল আলম রবি) জন্য মাঠেও কাজ করেছি...। সেই কাজটা আমি জেমিন ভাইয়ের নেতৃত্বেই জেমিন ভাইয়ের সাথে করেছি। এখন বিষয়টা এরকম, সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি। এতদিন তার সাথে ছিলাম, এতদিন আমার কোনো সমস্যা ছিল না। এখন আমি ছাত্রলীগ হয়ে গেলাম?

এ বিষয়ে  নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব হোসেন, ভুক্তভোগী একটা অভিযোগ দিয়েছে। যিনি অভিযোগকারী, আমরা তার সঙ্গে কথা বলেছি। দরখাস্তটা পড়েছি, ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারে। আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। এখানে তো কোনো সুযোগ নেই। আগে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে নেই। আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাকে কক্সবাজারে যোগাযোগ করতে বলব।

ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আমাদের কাছে এবং থানাতে অভিযোগ দিয়েছে। বর্তমানে থানা তদন্ত করছে। বিষয়টি যেহেতু তদন্তাধীন, তাহলে প্রকৃত ঘটনা আসলে উদ্ঘাটন করে, এটার সত্যতা যাচাই করে, তারপরে যদি এমন ঘটনা ঘটে সেক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা কেন্দ্রীয় সংসদকে অবগত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রদলে সংগঠন পরিপন্থী কোনো কাজ কেউ করলে বিরুদ্ধে তো আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। সেন্ট্রাল বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সত্যতা পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ন্যায় প্রশ্রয় পাওয়ার কোনো সুযোগ ছাত্রদল নেই।