০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৫৬

‘গুপ্ত’ বাছাইয়ে আটকা ছাত্রদলের কমিটি

ছাত্রদল  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

আন্দোলন ও মাঠ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় ৭ মাস আগে। বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতারা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিদায়ের বার্তাও দিয়েছেন। নতুন নেতৃত্বের সম্ভাব্য তালিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপও ছিল তুঙ্গে। কিন্তু আজ (৪ অক্টোবর) পর্যন্ত নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হয়নি।

নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তুতি একাধিকবার প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও শেষ মুহূর্তে তা থেমে যাওয়ার নেপথ্যে এখন আলোচনায় সামনে এসেছে ‘গুপ্ত’ আতঙ্ক। উঠে এসেছে সব বিবেচনায় উতড়ে যাওয়া ‘পলিশড’ ও ‘স্মার্ট’ ছাত্রনেতা খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টিও। আবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উভয় কমিটির শীর্ষ পদের দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা কয়েক নেতার বিরুদ্ধে অতীতে নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততা, মাদ্রাসা শিক্ষাজীবন গোপন করা এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশের বিষয়টিও সামনে আসছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্রগুলোর ভাষ্য, সম্ভাব্য নেতৃত্বের রাজনৈতিক অতীত, ছাত্রত্ব, সাংগঠনিক পরিচয় এবং অন্য ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে অতীত বা বর্তমান সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন করে বারবার যাচাই করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিএনপির অঙ্গদল সমূহের কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ছাত্রদলও এর বাইরে নয়। বিএনপি অনেক বড় একটি দল। তাদের অনেক বিষয় সামনে রেখেই কাজ করতে হয়। ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, মেধাবী, শিক্ষার্থী বান্ধব, পরিশ্রমী ও সৎ নেতৃত্বকেই বেছে নেয়া হবে।’

দলটির ভেতরের আলোচনায় উঠে এসেছে, ছাত্রদলে বর্তমানে নেতা বনে যাওয়া অধিকাংশই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সময় তথা ২০১৪ বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অবস্থান করতেন। যাদের বড় অংশই তৎকালীন সময়ে রাজত্ব করা ছাত্রলীগের হাত ধরে হলে উঠেছেন এবং শর্ত মোতাবেক মিছিল-মিটিং-গেস্টরুমে অংশ নিয়েছেন। এসব নেতাকর্মীদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব নেতাদের কেউ কেউ নিজেদের আগের রাজনৈতিক আদর্শ প্রকাশ না করলেও দলীয় পর্যায়ে বিষয়টি অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। একইভাবে ছাত্রলীগের বাইরে ইসলামপন্থী ও বাম ঘরানার বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের অনেক কর্মীও পরবর্তী সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। তবে স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসায় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিবির থেকে দলছুট কিংবা বহিস্কৃত হয়ে ছাত্রদলে সক্রিয় হয়েছেন; এমন ব্যক্তিদের একটি অংশ নিজেদের অতীত পরিচয় (শিবির সমর্থক-কর্মী-সাথী) প্রকাশ করেন না। বিষয়টি ছাত্রদলের ভেতরে মুখে মুখে আলোচিত হলেও নিজের রাজনীতি টিকিয়ে রাখাসহ অনেক কারণেই তা প্রকাশ্য না এসে ‘সিক্রেট’ থেকে যায়। আর এই গোপন অতীত ও পরিচয়ের অস্পষ্টতাকেই নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সন্দেহের চোখে দেখছেন বিএনপির হাইকমান্ড।

‘‘স্কুল-কলেজ জীবনে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই সম্পৃক্ততা ছিন্ন করেছেন; এমন ঘটনা ঘটে। তবে শিবিরের পদ বাতিল হওয়ার পর কেউ যেকোনো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলে সে বিষয় নিয়ে শিবিরের কোনো মন্তব্য নেই। এটি অনেকের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। এক ছাত্র সংগঠন থেকে আরেক ছাত্রসংগঠনে যাওয়া কারও কারও ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস রাজনীতির অংশ।’—আজিজুর রহমান আজাদ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী ছাত্রশিবির

ছাত্রদলে আসলেই কি ছাত্রশিবির কিংবা ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশ রয়েছে? বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় ছাত্রলীগের কারও মন্তব্য নেওয়া হয়নি। জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘স্কুল-কলেজ জীবনে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই সম্পৃক্ততা ছিন্ন করেছেন; এমন ঘটনা ঘটে। কেউ যদি শিবিরের শুধু কর্মী বা সমর্থক পর্যায়ে থাকেন, তাহলে তাকে নিয়ে আমাদের সাংগঠনিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কেউ সাথী বা সদস্য পর্যায়ে থাকলে কার্যকরী পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তার পদ বাতিল করা হয়। এটাই আমাদের সাধারণ সাংগঠনিক প্রক্রিয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিবিরের পদ বাতিল হওয়ার পর কেউ যেকোনো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলে সে বিষয় নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। এটি অনেকের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। এক ছাত্র সংগঠন থেকে আরেক ছাত্রসংগঠনে যাওয়া কারও কারও ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস রাজনীতির অংশ।’

বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে ‘কঠিন দ্বিধা’য় রয়েছে বিএনপি। নিজেদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল, পকেট কমিটি ও অনুপ্রবেশ আতঙ্কই ছাত্রদলের নতুন কমিটি বিলম্বিত হওয়ার মূল কারণ বলে তারা জানান। তারা এ-ও জানান, ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠকে খোদ বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাত্রদলে বিশুদ্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মী খুঁজে না পাওয়ার কথা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি ছাত্রদলকে পরিশুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও সূত্রটি জানায়।

সূত্র জানায়, বিএনপির আশঙ্কা শুধু ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ঘিরে নয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগও নিজেদের সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলে পরিচয় গোপন করে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে— এমন আশঙ্কাও হাইকমান্ডের আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অর্থাৎ নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে ‘গুপ্ত’ প্রশ্নটি এখন দ্বিমুখী— একদিকে শিবিরের দলছুট, বহিষ্কৃত ও সম্ভাব্য কৌশলগত অনুপ্রবেশ, অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত ছাত্রলীগের সম্ভাব্য আত্মগোপন করে ছাত্রদলে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা।

‘বিএনপির অঙ্গদল সমূহের কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ছাত্রদলও এর বাইরে নয়। বিএনপি অনেক বড় একটি দল। তাদের অনেক বিষয় সামনে রেখেই কাজ করতে হয়। ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, মেধাবী, শিক্ষার্থী বান্ধব, পরিশ্রমী ও সৎ নেতৃত্বকেই বেছে নেয়া হবে।’— রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

শক্তিশালী তামীরুল মিল্লাত কোরাম
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের গাজীপুর ও তামীরুল মিল্লাত প্রতিবেদক জানান, তামীরুল মিল্লাত ইসলামী ছাত্রশিবিরের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই কোনো না কোনোভাবে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আবার যারা শিবির করেন না, বলতে গেলেও তারাও এই ক্যাম্পাসে সংগঠনটির সমর্থক। ব্যতিক্রম যে নেই, সেটাও বলা যাবে না। অনেকেই এখানে ছাত্রশিবিরকে অপছন্দ করেন। তবে সংখ্যাটা কম।

জানা যায়, তামীরুল মিল্লাত থেকে অধ্যায়ন করা বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা বর্তমানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। যাদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও শিবিরের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন থাকায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়াতেও এর প্রভাব পড়ছে বলে দলের কয়েকটি সূত্রের দাবি।

২০২৫ সালের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনেও ছাত্রদলের প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কয়েকজন নেতার শিক্ষাজীবনের সঙ্গে তামীরুল মিল্লাতের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এমনকি অতীতে শিবিরের কমিটিতে ছিলেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। ছাত্রদল সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু ২০২৫-এর ডাকসু নির্বাচন নয়, এর আগে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটির (ডাকসু ও হল সংসদ) শীর্ষ পদেও তামীরুল মিল্লাত থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ছিল হল সংসদ নির্বাচনেও।

এ পরিস্থিতিতে তামীরুল মিল্লাত-সংশ্লিষ্ট নেতাদের রাজনৈতিক অতীত, শিবিরের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য যোগাযোগ এবং বর্তমানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামোয় তাদের অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। শিবিরের সঙ্গে আঁতাত করে কেউ ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামোয় ‘গুপ্ত’ভাবে অবস্থান করছেন কি না—এমন আশঙ্কাও যাচাই করা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। ফলে সম্ভাব্য বিতর্ক এড়াতে এবং নেতৃত্বের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি ঘোষণায় বিলম্ব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

দুই ধরনের ‘গুপ্ত’ আতঙ্ক
ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বে অনুপ্রবেশের প্রশ্নটি একেবারে নতুন নয়। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরকে সরাসরি শিবির ও ছাত্রলীগ—দুই সংগঠন থেকেই সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি তখন বলেন, ছাত্রদলের কাঠামোতে এ ধরনের অনুপ্রবেশ টেকসই হবে না এবং নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটে ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশ নিয়ে বহু বছর ধরেই অভিযোগ উঠেছে। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের কমিটির নেতৃত্বে আসে সোহাগ-জাকির। অভিযোগ ছিল সাবেক মাদ্রাসা ছাত্র জাকির শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ঠ ছিলেন। ২০১৬ সালে নরসিংদী জেলা ছাত্রলীগের এক নেতার বিরুদ্ধে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছিল; তখন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও বিষয়টি তদন্ত করে প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ ধরনের অভিযোগ আরও আলোচনায় আসে। ২০২৬ সালের ছাত্রদলের পক্ষ থেকেই অভিযোগ করা হয়, আওয়ামী লীগ শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগের পরিচয়ে কার্যক্রম চালিয়েছে। ফলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় প্রশ্নটি এখন উল্টো দিক থেকেও দেখা হচ্ছে—যে কৌশলে অতীতে শিবিরের কেউ কেউ ছাত্রলীগের কাঠামোয় নিজেদের পরিচয় আড়াল করে থাকার অভিযোগের মুখে পড়েছিল, ক্ষমতাচ্যুত ছাত্রলীগের কেউ কি এবার একই কৌশলে ছাত্রদলে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি এখনো আশঙ্কা ও সম্ভাবনার বিষয়, প্রমাণিত কোনো সাংগঠনিক অনুপ্রবেশের সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ডের যাচাই-বাছাইয়ে বিষয়টি অতীব গুরুত্ব পাচ্ছে বলেই দলীয় সূত্রগুলোর দাবি।

২০২৫ সালের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনেও ছাত্রদলের প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কয়েকজন নেতার শিক্ষাজীবনের সঙ্গে তামীরুল মিল্লাতের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এমনকি অতীতে শিবিরের কমিটিতে ছিলেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। ছাত্রদল সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু ২০২৫-এর ডাকসু নির্বাচন নয়, এর আগে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটির (ডাকসু ও হল সংসদ) শীর্ষ পদেও তামীরুল মিল্লাত থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ছিল হল সংসদ নির্বাচনেও।

রাকিব ও নাছির ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসেন ২০২৪ সালের ১ মার্চ

অতীতের অভিজ্ঞতা নতুন উদ্বেগের কারণ
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে ছাত্রলীগের কাঠামো ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে সরে যায়। ছাত্রলীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। এই পরিস্থিতিতে তাদের একটি অংশ ভবিষ্যতে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্য কোনো সংগঠনের ছায়ায় যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা বিএনপির কিছু নেতার মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘদিনের গোপন সাংগঠনিক কার্যক্রমের অভিযোগ। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ সীমিত থাকলেও শিবিরের কর্মীরা ছাত্রলীগ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনে অনুপ্রবেশ করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়েছে— যা জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রকাশ্যে আসে। ফলে বিএনপির কাছে এবারের পরিস্থিতি আলাদা। একদিকে দীর্ঘদিনের ‘ঘনিষ্ট মিত্র ও  প্রতিদ্বন্দ্বী’ শিবিরের সম্ভাব্য কৌশলগত অনুপ্রবেশ, অন্যদিকে ক্ষমতা হারানো ছাত্রলীগের সম্ভাব্য আত্মগোপন—দুই আশঙ্কাকেই একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

ছাত্রত্ব ফিরবে কি ছাত্রদলের নেতৃত্বে?
নতুন কমিটি গঠনের আলোচনায় আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—এবার কি সত্যিকার অর্থে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের হাতে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেওয়া হবে? দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহে নিয়মিত শিক্ষার্থী, মেধাবী, পরিচিত ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য মুখকে নেতৃত্বে আনার পক্ষে মত এসেছে। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের স্বাধীনচেতা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক আচরণ আগের প্রজন্মের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় ছাত্রদলের নেতৃত্ব কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই জায়গাতেই দেখা দিয়েছে পুরোনো বনাম নতুন নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব।

দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের একটি অংশের যুক্তি—ক্যাম্পাস রাজনীতি কেবল নিয়মিত ছাত্র হওয়ার বিষয় নয়; সংগঠন পরিচালনা, প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক মোকাবিলা এবং সংকট সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। অন্যদিকে তরুণ নেতৃত্বের পক্ষে থাকা অংশ মনে করে, দীর্ঘদিন ছাত্রত্বের বাইরে থাকা নেতাদের দিয়ে ছাত্রসংগঠন পরিচালনা করলে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়বে।

রাকিব-নাছির কমিটির সাংগঠনিক প্রশ্ন
নতুন কমিটি বাছাইয়ের সময় বর্তমান নেতৃত্বের সাংগঠনিক রেকর্ডও আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া বর্তমান নেতৃত্বের অন্যতম সমালোচনার জায়গা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্রার্থীদের প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া নিয়ে সংগঠনের ভেতরেও আলোচনা হয়েছে।

বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু নির্বাচনের ফল ছাত্রদলের জন্য বড় একটি রাজনৈতিক সংকেত বা ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বিএনপিতে। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ভিপি পদে ৫ হাজার ৭০৮ ভোট পান; বিপরীতে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের সাদিক কায়েম পান ১৪ হাজার ৪২ ভোট। জিএস ও এজিএসসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদেও শিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সাংগঠনিক শক্তি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি কোথায়? তবে ডাকসুর ফলকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখছেন না ছাত্রদলের নেতারা। তাদের বক্তব্য, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ভূমিকা, মামলা-গ্রেপ্তার, রাজপথের আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে সংগঠন পুনর্গঠনের কাজও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বলয়ভিত্তিক রাজনীতি, পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ এবং ইউনিট কমিটি গঠন নিয়ে অসন্তোষও রাকিব-নাছির কমিটির সময়ে সামনে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটি নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। কিছু শিক্ষার্থী ও সংগঠনের নেতারা হলগুলোতে শিবিরের গোপন সাংগঠনিক কার্যক্রমের অভিযোগ তুলেছেন; অন্যদিকে এসব অভিযোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে ৪৫টি ইউনিটের কমিটি ঘোষণার পরও বিভিন্ন জায়গায় পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভের খবর এসেছে। ফলে নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে শুধু কমিটি ঘোষণা নয়, তৃণমূলের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্নও থাকছে।

পুরোনো বলয় বনাম নতুন প্রজন্ম
ছাত্রদলের নেতৃত্বকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বলয়ভিত্তিক রাজনীতিও এবার আলোচনায় এসেছে। এই বলয়কে ছাত্রদলের ‘পুরনো অসুখ’ হিসেবে দেখা হয়। দলটির অভ্যন্তরের একটি অংশ মনে করে, নব্বইয়ের দশক থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাছাইয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি বলয়ের ভূমিকা রয়েছে। নতুন প্রজন্মের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সামনে আনলে সেই পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। আবার পুরোনো নেতৃত্বের পক্ষে থাকা অংশের যুক্তি, রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে একেবারে নতুন মুখ সামনে আনলে সংগঠন মাঠের রাজনীতিতে দুর্বল হতে পারে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ‘গুপ্ত’আতঙ্ক।

কাউকে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাদ দেওয়া যেমন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, তেমনি ক্ষমতাচ্যুত ছাত্রলীগের কোনো কর্মী পরিচয় গোপন করে ঢুকে পড়লে সেটিও ভবিষ্যতে বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক বিব্রতকর ও বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ফলে কার রাজনৈতিক অতীত কী, কে কোন সময়ে কোথায় সক্রিয় ছিলেন, কার সঙ্গে কার সাংগঠনিক যোগাযোগ ছিল—এসব তথ্য যাচাই এখন নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বিএনপির সামনে প্রশ্ন—নিয়মিত শিক্ষার্থী হলে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কেমন হবে, আর কতটা গ্রহণযোগ্য হবে পরীক্ষিত বয়স্করা 

সামনে বিএনপির কঠিন বাছাই
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে তাই একাধিক প্রশ্ন। নিয়মিত শিক্ষার্থীকে নেতৃত্বে আনলে তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কতটা? দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের রাখলে তাদের ছাত্রত্ব ও প্রজন্মগত গ্রহণযোগ্যতা কতটা? সম্ভাব্য প্রার্থীদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা সম্ভব? এবং সবচেয়ে বড় কথা—শিবির কিংবা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেউ পরিচয় গোপন করে ঢুকে পড়ছে কি না, সেটি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আটকে আছে ছাত্রদলের নতুন কমিটি। আগস্টে বিদায়ী সাক্ষাতের পর নতুন কমিটি ঘোষণার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শেষেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে পদপ্রত্যাশীদের লবিং, সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা এবং ভুয়া কমিটি ঘোষণার গুজব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

ছাত্রদলের নতুন কমিটি ও ‘গুপ্ত আতঙ্ক’সহ সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিএনপির অঙ্গদল সমূহের কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ছাত্রদলও এর বাইরে নয়। বিএনপি অনেক বড় একটি দল। তাদের অনেক বিষয় সামনে রেখেই কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, যে কোনো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলের যাদের অবদান রয়েছে তাদের মূল্যায়ন করা হয়। ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, মেধাবী, শিক্ষার্থী বান্ধব, পরিশ্রমী ও সৎ নেতৃত্বকেই বেছে নেয়া হবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, দল যখন প্রয়োজন মনে করবে তখনই কমিটি ঘোষিত হবে। তবে সেটি খুব বেশি বিলম্বিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।