০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২২

চাকরির ভাইভায় নম্বর বৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তাল দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল রাতের আন্দোলনের চিত্র  © টিডিসি ফটো

সরকারি চাকরিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১১-২০তম গ্রেড) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

নতুন খসড়া নিয়োগ বিধিমালায় গ্রেডভেদে মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে মেধার মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিয়োগ-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সুপারিশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরির ১১-২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিক্ষোভ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। এতে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ ডাকসুর নেতাকর্মী ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। বিক্ষোভে ভাইভায় বেশি নম্বর রাখার প্রস্তাবকে ‘নব্য কোটা’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু)। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমিয়ে বিধিমালা পরিবর্তনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়। পরে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে আবার একই জায়গায় এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরির নতুন খসড়া নিয়োগ বিধিমালায় ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু)। প্রস্তাবিত এ পরিবর্তনকে অযৌক্তিক দাবি করে আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টায় ক্যাম্পাসে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে চাকসু।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়। পরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাহাদুর শাহ পার্ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এসে শেষ হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন।

এছাড়া আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে রফিক ভবনের সামনে ফের বিক্ষোভ মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)।

আরও পড়ুন: সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বরও কমছে, ভাইভায় বাড়ছে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরিতে অযৌক্তিকভাবে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধি করে মেধার অবমূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক সুপারিশ ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ সৃষ্টি বন্ধের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে। ‘শিক্ষার্থীবৃন্দ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ব্যানারে কর্মসূচির আয়োজন করা হচ্ছে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত অংশের নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত অংশের নম্বর কমিয়ে ভাইবার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা আখ্যা দিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। পরে ক্যাম্পাসের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় শহীদ মিনারে এসে সমাবেশ করেন তারা।

ঢাকা কলেজ
সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ঢাকা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা কলেজের লাইব্রেরি থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। পরে মিছিলটি হলপাড়াসহ ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে বিজয়-২৪ হলের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

সরকারি তিতুমীর কলেজ
সরকারি চাকরির নতুন খসড়া নিয়োগ বিধিমালায় ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে জাতীয় ছাত্রশক্তি, তিতুমীর কলেজ শাখা। প্রস্তাবিত এ পরিবর্তনকে অযৌক্তিক দাবি করে আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে তিতুমীর কলেজের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

যে পরিবর্তনের প্রস্তাব
এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাগুলোর ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বর্তমান বিধান অনুযায়ী, কারিগরি পদ ছাড়া প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় ৭০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ শতাংশ নম্বর নির্ধারিত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ মানবণ্টনের ভিত্তিতেই এসব পদে নিয়োগ হয়ে আসছে। প্রশাসনে এ স্তরে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৩ লাখ ২৪ হাজার ৩৪৩টি।

তবে নতুন বিধিমালায় ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনটি স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ১১-১২তম, ১৩-১৬তম এবং ১৭-২০তম গ্রেড। প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, ১১-১২তম গ্রেডের কোনো পদে সরাসরি নিয়োগের পরীক্ষায় মোট ১৫০ নম্বর থাকবে। এর মধ্যে মৌখিক পরীক্ষায় থাকবে ৫০ নম্বর। বাকি ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় বাংলায় ২৫, ইংরেজিতে ২৫, গণিতে ২৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ২৫ নম্বর থাকবে।

আরও পড়ুন: চাকরির পরীক্ষায় বাড়ছে মৌখিকের নম্বর, তথ্য উপদেষ্টা বললেন—‘ভাইভা কি পরীক্ষা না?’

১৩-১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৪০ নম্বর রাখা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বর করে থাকবে। অন্যদিকে, ১৭-২০তম গ্রেডের পদে মোট ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ২৫ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ২৫ নম্বর থাকবে। লিখিত পরীক্ষার ২৫ নম্বরের মধ্যে বাংলায় ১০, ইংরেজিতে ৫, গণিতে ৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ৫ নম্বর রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কারিগরি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিমালায় কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে ব্যবহারিক পরীক্ষাতেও পাস করতে হবে। লিখিত ও ব্যবহারিক দুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই তিনি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তাকে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হবে না।

তবে প্রস্তাবিত বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, আনসার ব্যাটালিয়ন, কোস্ট গার্ড, র‌্যাব বা অন্য কোনো বাহিনী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আওতাভুক্ত কোনো পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

যে কারণে বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ
নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কারণ ব্যাখ্যা করে সচিব কমিটির জন্য পাঠানো সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাসমূহের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কার্যক্রমে কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী নিজে অংশগ্রহণ না করে নানা অসদুপায় অবলম্বন করে চাকরি লাভের চেষ্টা করছেন।

এতে প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহারসহ নানা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি লাভের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে বলে সার-সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।