জবিতে হামলায় আহতদের ভর্তি: ন্যাশনাল মেডিকেলে গিয়ে দুই দফায় হুমকি বিএনপি-ছাত্রদলের
সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল ভর্তি করাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী মো. জসিম উদ্দিনকে চাকরিচ্যূত, হেনস্তা ও হুমকি দিয়েছেন সূত্রাপুর থানা বিএনপি ও কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক। হুমকি দেওয়া হয়েছে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (হিসাব) রাসেল মিয়াকেও। আজ শনিবার (৮ আগস্ট) বেলা পৌনে ১২টা থেকে দুপুর সোয়া ১২টার মধ্যে দুই দফায় এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ তারিখ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, জকসু, শিবির, ছাত্রশক্তি ও বাম সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে আহতরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি হন। আহতদের মধ্যে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরার পিএস জসিমের এক আত্মীয়ও ছিলেন। তখন তার আত্মীয়কে ভর্তি ও চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা করেন জসিম। পাশাপাশি সংঘর্ষে আহত অন্যদেরকেও তিনি চিকিৎসা সেবায় সহযোগিতা করেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে আহত কয়েজন শিক্ষার্থীর চিকিৎসা সহায়তা করার কারণে বিএনপি নেতা ও ছাত্রদল নেতা আমাকে চাকরিচ্যূতিসহ হুমকি ও হেনস্তা করেন। আজ আমার রুমে ও পরিচালক ম্যাডামের রুমে এসে আমাকে ধাক্কা ও থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেওয়ার হুমকি দেয়। আমাকে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যেতে বলে—ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী মো. জসিম উদ্দিন
এ কারণে আজ শনিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে হাসপাতালের পিএস জসিমের রুমে আসেন সূত্রাপুর থানা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আজিজুল ইসলাম, তার কয়েকজন নেতাকর্মী ও হাসপাতালের কয়েকজন ওয়ার্ডবয়। পিএসের রুমে প্রবেশ করেই আজিজুল তাকে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বলেন এবং হাসপাতালে আর না আসতে বলেন। পাশাপাশি তাকে হুমকি দেওয়াসহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
পরে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পিএসের রুমে আসেন কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমদ ফাহিম। এ সময় তার সঙ্গে আরও ২০-২৫ জন ছিলেন। তারা রুমে এসেই একইভাবে জসিমকে তাৎক্ষণিক হাসপাতাল ছাড়তে বলেন এবং আর না আসতে বলেন। পরে জসিম পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরার রুমে গিয়ে পরিস্থিতি জানান এবং করণীয় জিজ্ঞাসা করেন। এমন সময়ই পরিচালকের রুমে প্রবেশ করেন ছাত্রদল নেতা ফাহিম।
এসময় জসিম পরিচালকের কাছে আবারও চলে যাওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে ফাহিম বলেন—‘তিনি কী বলবেন? আমি বলছি এখনি বের হয়ে যেতে।’ ফাহিম পরিচালকের রুমে প্রবেশ করেই জসিমকে বলেন—‘এখানে কি করছিস?’ এরপর পিএসকে ধাক্কা দিয়ে দরজা থেকে বের করে দেওয়া হয়।
জবির আহত শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার কারণেই তাকে হেনস্তা ও অফিস থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ জসিমের। এ ছাড়াও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (হিসাব) রাসেল মিয়ার সঙ্গেও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন ছাত্রদলের আহ্বায়ক।
হাসপাতালের পরিচালকের পিএসকে কোনো ধরনের হুমকি বা শাসানো হয়নি। এই কর্মকর্তা ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তিনি এখনও বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করেন— ইরফান আহমদ ফাহিম, কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদল
হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমদ ফাহিম বেলা ১২.১০ মিনিটে হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপরই পিএস জসিমকে বের করে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরার পিএস মো. জসিম উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জবিতে সংঘর্ষে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করায় হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। বিএনপি নেতা ও ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়। তারা আমাকে হাসপাতাল থেকে চলে যেতে বলে, তাৎক্ষণিক অফিস ছাড়তে বলে। কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ফাহিমসহ ২০-২৫ জন আমার অফিসকক্ষে ঢোকে। একপর্যায়ে চাকরিচ্যুতির হুমকিসহ ধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, জবির সংঘর্ষের পর আহত কয়েকজন শিক্ষার্থী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেন। এ সময় আমার এক ভাতিজাও হাসপাতালে আসেন। তার ভর্তিসহ চিকিৎসা সহায়তার জন্য ডাক্তারদের অনুরোধ করি। এ সময় পরিচিত আরও আহত কিছু শিক্ষার্থী হাসপাতালে আসলে তাদের জন্যও সুপারিশ করি। স্বাভাবিকভাবেই আহতদের চিকিৎসা দেওয়াটা একটা মানবিক বিষয়। সে জায়গা থেকেই তাদের সহযোগিতা করা। এ কারণে বিএনপি নেতা ও ছাত্রদল নেতা আমাকে চাকরিচ্যূতিসহ হুমকি ও হেনস্তা করেন।
তিনি আরও বলেন, সংঘর্ষের পর পরিচিতদের হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার অনুরোধের পর, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে হাসপাতাল থেকে চলে আসি। সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে সে সময় আমি হাসপাতালে ছিলাম না।
‘আমি পরিচালক ম্যাডামের রুমে গিয়ে যখন বললাম, ম্যাডাম— তারা আমাকে চলে যেতে বলছে, এখন আমি কী করব? আমি কি চলে যাব? কথা শেষ করার আগেই কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদল আহ্বায়ক ফাহিম ম্যাডামের রুমে ঢুকে আমাকে বলে, এখানে কী করছিস? এরপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে দরজা থেকে বের করে দেয় এবং তিনি কি বলবেন, আমি বলছি এখনি বের হয়ে যেতে— মো. জসিম উদ্দিন
ভুক্তভোগী বলেন, আজকে বিএনপি নেতা আজিজের নেতৃত্বে হাসপাতালের কয়েকজন ওয়ার্ড বয়সহ বেশ কয়েকজন নেতা আমার রুমে প্রবেশ করেন। সংঘর্ষের সময় আমি কোথায় ছিলাম তা জানতে চায়, তখন আমার অবস্থান জানায়। পরে তারা আমার পুরাতন কিছু ছবি দেখায় এবং থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন তারা।
ছবির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সে সময় আমি ডিরেক্টরের পিএস ছিলাম। ডিরেক্টর আমাকে যেখানে যেতে বলা হতো, সেখানে যাওয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে ছিল। কিন্তু ছবিটি দেখিয়ে বিএনপি নেতা উত্তেজিত হয়ে আমাকে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেওয়ার কথা বলেন। তিনি আমাকে কাল থেকে অফিসে না আসতে বলেন এবং চাকরি থাকবে না বলেও হুমকি দেন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি নেতা চলে যাওয়ার পর কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ফাহিমসহ ২০-২৫ জন আমার অফিসকক্ষে আসেন। তারা আমাকে অফিসে না আসার নির্দেশ দেন এবং একপর্যায়ে তাৎক্ষণিকভাবে অফিস থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। তারা প্রথমে বলল, কাল থেকে অফিসে আসবেন না, অফিস করতে পারবেন না। পরে আবার এসে বলল, কাল পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হবে না, এখনই বের হয়ে যেতে হবে। আমাকে এক মিনিট সময় দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতি নিয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অর্থ্যাৎ পরিচালক ম্যাডামের রুমে যাই। সেখানে কথা বলার সময়ও ছাত্রদল নেতারা আবার পরিচালকের রুমে প্রবেশ করেন এবং আমাকে পরিচালকের কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেন, তখন আমি ম্যাডামকে বিষয়টি বললে, ছাত্রদল নেতা বলেন—‘তিনি কি বলবেন, আমি বলছি এখনি বের হয়ে যেতে।’
জসিম বলেন, আমি পরিচালকের রুমে গিয়ে যখন বললাম—ম্যাডাম, এরা এমন এমন কথা বলছে, এখন আমি কী করব? আমি কি চলে যাব? কথা শেষ করার আগেই তারা ম্যাডামের রুমে ঢুকে আমাকে বলে, এখানে কী করছিস? এরপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে দরজা থেকে বের করে দেয় এবং এখনই চলে যেতে বলে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সূত্রাপুর থানা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আজিজুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি ন্যাশনাল হাসপাতালের গভর্নিং বডির একজন সদস্য, নিয়মিতই রোগীদের খোঁজ-খবর নিতে যাই। আজকেও গিয়েছিলাম। তাই আজ যখন যাই, তখন আমি হাসপাতালের পরিচালকের পিএসকে চাকরি ছাড়তে বলিনি, বরং অন্যদের হাত থেকে তাকে বাঁচিয়েছি। অন্যরা তার ওপর হামলা করতে পারে—এমন পরিস্থিতি থেকে তাকে বাঁচাতে সতর্ক করেছি। তাকে ধমক দিয়ে বরং তার উপকার ও রক্ষা করেছি। আমি কাউকে চলে যেতে বলতে পারি না, এটা আমার কাজও না।
হুমকির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ রয়েছে, আপনারা খোঁজ নেন। জগন্নাথের ঘটনার দিন জসিম একটি সংগঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আরেক পক্ষকে মার খাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করছিলেন। জসিম একটি সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং ৪ তারিখের সংঘর্ষের ঘটনাকে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল। এ বিষয়ে জসিমের ফাইল ও সংশ্লিষ্ট তথ্য খোঁজ নেওয়ার জন্য আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি।
কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমদ ফাহিম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জবির আহত শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোর বিষয়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের পিএসকে শাসানো হয়নি এবং পরিচালকের পিএসকে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হয়নি। যে অভিযোগটি করা হচ্ছে, তা মিসইনফরমেশন। এই কর্মকর্তা ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তিনি এখনও বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করেন।
তার বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনকে মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। এই কর্মকর্তাকে সরাসরি ‘এখনই চলে যান’ বলা হয়নি, বরং তাকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা অবস্থায় তার এখানে চাকরি করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং তার চলে যাওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমি তাকে শাসাইনি। আমি শুধু বলেছি, আপনি আওয়ামী লীগ করেন, আপনার বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ দিয়ে আসছি। আপনার বিষয়ে আমরা প্রশাসনকে অবহিত করে আসছি। আপনি এখনও কীভাবে চাকরি করেন— এটাই তাকে বলেছি।’
তিনি জানান, এই কর্মকর্তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়ার জন্য হাসপাতাল প্রশাসনকে অনুরোধ করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে তাকে চাকরিতে না রাখার দাবি জানিয়েছেন। তিনি হাসপাতালে আবারও দায়িত্ব পালন করতে আসলে তার বিরুদ্ধে হাসপাতালের সামনে আন্দোলন করার কথা প্রশাসনকে জানিয়ে এসেছেন। আজ হাসপাতালে যাওয়ার মূল কারণ হলো— সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ও উপপরিচালকসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহিত করা। এর সঙ্গে জবির আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে ভর্তি করার কোনো সম্পর্ক নেই।
সার্বিক বিষয়ে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমার রুমে যারা এসেছিলেন, তাদের তেমন চিনি না। কিছু লোক এসেছিল, আমার পিএসসহ আমার আরেক এডিকেও (সহকারী পরিচালক) বের করে দিয়েছে। এসব বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ও পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছি।