দুই দিনে তিন বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ, আহত প্রায় ২০০
আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, কর্মসূচিতে বাধা এবং বহিরাগত প্রবেশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত দুই দিনে দেশের অন্তত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন পক্ষের দাবি। আহতদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিক্ষক, জকসু নেতাসহ উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বেশ কয়েকটি ক্যাম্পাসে লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া, ভাঙচুর এবং হাসপাতালের ভেতরেও হামলার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাত থেকে বুধবার (৫ আগস্ট) পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে জকসু, ছাত্রশক্তি, ছাত্রদল ও প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস, ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ অন্তত ৭০ জন আহত হন।
আমি স্পষ্ট ভাষায় বলছি, জামায়াত এবং শিবির—এই দুই দলকে মোকাবিলা করার জন্য একা ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমার যুবদল লাগবে না, স্বেচ্ছাসেবক দল লাগবে না, বিএনপিও লাগবে না। শুধু ছাত্রদলই যথেষ্ট।— রাকিবুল ইসলাম রাকিব, ছাত্রদল, সভাপতি
সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীনদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। পরে পাশের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন জকসু, ছাত্রশক্তি ও শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর দফায় দফায় হামলার অভিযোগ ওঠে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে। এ সময় সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ক্যাম্পাস ও আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পরে রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজেও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। কবি নজরুল কলেজে অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সরকারি বাংলা কলেজেও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। হামলার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ায়।
এসব সংঘর্ষে বিভিন্ন স্থানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, লাঠিসোঁটা, রড ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের উপস্থিতিতেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ঘটনায় উভয় সংগঠনই একে অপরকে হামলার জন্য দায়ী করেছে।
ঢাকা কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ছাত্রশিবিরের আলোচনা সভার প্রস্তুতিকালে সংঘর্ষ বাধে। পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ পরে একাধিক দফায় সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে ছাত্রশিবিরের ২০ জন এবং ছাত্রদলের সাতজনসহ অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সংঘর্ষের পর লাঠিসোঁটা হাতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে দেখা যায়। নিউমার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় জড়িতরা প্রকৃত শিক্ষার্থী নয়, তারা ছাত্র সন্ত্রাসী ও বহিরাগত। ছাত্রদলের বিভিন্ন কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে, যাদের ছাত্রজীবন বহু আগেই শেষ হয়েছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ থেকে ভাড়া করা লোক এনে শিক্ষাঙ্গনে হামলা চালানো হয়েছে।— নূরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সভাপতি, ছাত্রশিবির
এর মধ্যেই বিকেলে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় হলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। পরে ছাত্রদল হলের কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালায় এবং শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। শিবিরের দাবি, তাদের ২৫ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের দাবি, তাদের ৩০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার দিন গড়িয়ে গভীর রাতে সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রশিবিরের ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে মারধর করে আবাসিক হল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। আহত হন মেহেদী নামে এক শিবিরকর্মী। ছাত্রদলের দাবি, তারা নাশকতার পরিকল্পনার খবর পেয়ে ওই অভিযান চালিয়েছে। শিবিরের দাবি, বিনা উসকানিতে তাদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সোমবার রাতে প্রদর্শনীতে টানানো ছবি নিয়ে বিরোধের জেরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। ঘটনার পরদিন ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে দুই সংগঠন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে 'শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস' লিখে দেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় তদন্তের ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
একই দিনে বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্রশিবিরের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, মারধর করে শিবিরের কর্মীদের ক্যাম্পাস ও দুটি ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এতে ১০ থেকে ১২ জন আহত হন। ছাত্রদল বলছে, শিবির অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করায় তারা প্রতিরোধ করেছে। তবে শিবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অদম্য জুলাই’ কর্মসূচির র্যালিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলামের পায়ে গুরুতর আঘাত ও রক্তক্ষরণ হয়। বহিরাগত অংশগ্রহণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডি উপস্থিত থাকলেও সংঘর্ষ ঠেকানো যায়নি।
সরকারি তিতুমীর কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসাইন ও সদস্যসচিব আল নোমান নিরবকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। আহতরা দাবি করেছেন, কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডা ছাড়াই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
সবশেষ বুধবার দুপুর ১২টায় নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে বুধবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন আহত হন। সংঘর্ষের পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আসেনি।
এ ঘটনার পর বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলছি, জামায়াত এবং শিবির—এই দুই দলকে মোকাবিলা করার জন্য একা ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমার যুবদল লাগবে না, স্বেচ্ছাসেবক দল লাগবে না, বিএনপিও লাগবে না। শুধু ছাত্রদলই যথেষ্ট।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি ইসলামী ছাত্রশিবির দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন, হুমকি, মববাজি ও সন্ত্রাসী কায়দায় রাজনীতি করতে চায়, তাহলে তাদের সেই পরিণতি ভোগ করতে হবে।কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সারা দেশে নিজেদের নেতাকর্মীদের সংযত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। জুলাই-আগস্টের স্মৃতিবিজড়িত এই সময়ে কোনো ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়ে শিবিরকে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ দিতে চায় না ছাত্রদল।’
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় জড়িতরা প্রকৃত শিক্ষার্থী নয়, তারা ছাত্র সন্ত্রাসী ও বহিরাগত। ছাত্রদলের বিভিন্ন কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে, যাদের ছাত্রজীবন বহু আগেই শেষ হয়েছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ থেকে ভাড়া করা লোক এনে শিক্ষাঙ্গনে হামলা চালানোর অভিযোগও করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি রাতে ঘুমন্ত শিক্ষার্থী ও ঢাকা গ্রাফিক্স আর্টস কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা করা হয়েছে।
নূরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকার ব্যর্থ হলে ছাত্রজনতাকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে এসব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করা হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে আবারও হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।