০৪ মার্চ ২০২৬, ১৭:১৭

ঢাকা পলিটেকনিকে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের নেপথ্যে রিকশা গ্যারেজে লাখ টাকার চাঁদাবাজি

ঢাকা পলিটেকনিকে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের নেপথ্যে রিকশা গ্যারেজে লাখ টাকার চাঁদাবাজি!  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

সোমবার (২ মার্চ) মধ্যরাতে হঠাৎই ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল-শিবিরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নেন অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে একজন ছাত্রদলকর্মী এবং একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী ছাড়া বাকি সবাই ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী। এ ঘটনায় ইনস্টিটিউটের লতিফ হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের আশেপাশের সড়ক ও প্রতিষ্ঠানটির খেলার মাঠে অবৈধ রিকশা গ্যারেজ স্থাপন ও সেখান থেকে চাঁদাবাজিকে ঘিরে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। এ ছাড়া এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলে যোগ দেওয়া সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীরা। এমনকি ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টদের নেতৃত্বে সংঘর্ষের কথা প্রকাশ্যে বলায় এক ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কারও করেছে কেন্দ্রীয় সংসদ।

এদিকে, ক্যাম্পাস ঘিরে নতুন করে রিকশা গ্যারেজ বসা শুরু হয়েছে। তবে তদন্তের আগে চাঁদাবাজি এবং অবৈধ রিকশা গ্যারেজ নিয়ে কথা বলতে নারাজ ইনস্টিটিউটটির অধ্যক্ষ। বলছেন, তদন্ত সাপেক্ষেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আশেপাশের রিকশা গ্যারেজের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার ঢাকা পলিটেকনিক ক্যাম্পাস ও তিনটি হলের আশেপাশের বিভিন্ন সড়ক এবং লাভ রোডে প্রতিষ্ঠানটির খেলার মাঠে অন্তত ৬ থেকে ৮টি স্পটে অন্তত ৩০টি অবৈধ রিকশা গ্যারেজ ছিল। গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একদল শিক্ষার্থী এসব গ্যারেজ উচ্ছেদ করেন। মূলত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে এই উচ্ছেদ হয়। উচ্ছেদ করতে গেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রিকশা গ্যারেজ সিন্ডিকেট সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে।

রিকশা গ্যারেজ উচ্ছেদের পর গ্যারেজ মালিকদের পাশাপাশি রিকশাওয়ালারাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উচ্ছেদের পর তারা অন্য গ্যারেজে গিয়ে রিকশা চার্জ দিচ্ছে। এতে কিছুটা বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। এজন্য এসব গ্যারেজ মালিক ও রিকশাচালক বারবার আগের এলাকায় ফিরে যেতে চাইছেন। এটা নিয়েই ছাত্রদের দু’পক্ষে মারামারি হয়েছে— নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গ্যারেজ মালিক

সে সময়ে রিকশা গ্যারেজ থেকে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। উচ্ছেদ করতে গেলে একাধিক রিকশাচালক জানান, পলিটেকনিক শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সাব্বির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিনের অনুসারীরা চাঁদার বিনিময়ে তাদের রিকশা গ্যারেজ থাকতে দেন। 

ছাত্রশিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষের পর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও রিকশা গ্যারেজ সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, সে সময়ে অবৈধ রিকশা গ্যারেজগুলোর কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে ৩ হাজার টাকা করে আদায় করতেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। প্রায় ৩০টি রিকশা গ্যারেজ থেকে সপ্তাহে চাঁদা উঠত অন্তত ৯০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, রিকশা গ্যারেজ উচ্ছেদ করা হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেখে নেওয়া হবে বলে হুমকি দেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পলিটেকনিকের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠন হলে পলিটেকনিকের আশেপাশের অবৈধ রিকশা গ্যারেজগুলো পুনরায় স্থাপনের উদ্যোগ শুরু হয়। অভিযোগ, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এতে জড়িত রয়েছেন। এ অবস্থায় সংঘর্ষের একদিন আগে অবৈধ গ্যারেজের ‘মহাজন’দের গ্যারেজ না বসাতে হুমকি দিয়ে আসেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনার পর ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উত্তেজনা বাড়তে থাকে, যা সোমবার রাতে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

রিকশা গ্যারেজ এবং চাঁদা সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। ছাত্রশিবির ঢাকা পলিটেকনিকের হল দখলে মরিয়া। জামায়াতের আমির আর কোনো ক্যাম্পাসে গিয়েছেন কিনা জানি না, কিন্তু পলিটেকনিকে তারা বেশ কয়েকবার গিয়েছেন। ওখানে তাদের লোক তেমন নাই, এজন্য বারবার হলটা দখলের চেষ্টা করছে— নাছির উদ্দিন নাছির, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক

এদিকে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের লতিফ হলের পাশের সড়ক ও খেলার মাঠে অবৈধ গ্যারেজ বসার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ও বুধবার (৪ মার্চ) সরেজমিনে ক্যাম্পাস এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, লতিফ হল সংলগ্ন সড়কের ঢাকা পলিটেকনিক ল্যাবরেটরি স্কুল মোড় ঘিরে দু’পাশে দুটি রিকশা গ্যারেজ বসেছে। এ ছাড়া খেলার মাঠে বসেছে আরেকটি রিকশা গ্যারেজ। খেলার মাঠে রিকশা গ্যারেজের পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং ও ভাঙারির দোকানও বসেছে। মাঠের এক পাশে পলিটেকনিক স্পোর্টস ক্লাবের ভবনের একটি কক্ষ একটি ছিন্নমূল পরিবারের দখলে রয়েছে।

পলিটেকনিকের খেলার মাঠের একপাশে এই রিকশা গ্যারেজ পুনরায় বসেছে, শিক্ষার্থীদের থেকে সংগৃহীত ছবি

নতুন করে বসা ও ২৭ জানুয়ারি উচ্ছেদের আগে ওই এলাকায় থাকা কয়েকটি রিকশা গ্যারেজের বেশ কয়েকজন কর্মচারী, মহাজন ও রিকশা শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। পরিচয় উন্মুক্ত হলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করতেন। এরপর এটি ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কোনো কোনো গ্যারেজ থেকে সাপ্তাহিক হারে, আবার কোনো কোনো গ্যারেজ থেকে দৈনিক হারে চাঁদা উঠত। কিন্তু গত ২৭ জানুয়ারি উচ্ছেদের পর ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তেমন সুবিধা করতে পারেননি।

একটি রিকশা গ্যারেজের একজন মহাজন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, রিকশা গ্যারেজ উচ্ছেদের পর গ্যারেজ মালিকদের পাশাপাশি রিকশাওয়ালারাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উচ্ছেদের পর তারা অন্য গ্যারেজে গিয়ে রিকশা চার্জ দিচ্ছে। এতে কিছুটা বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। এজন্য এসব গ্যারেজ মালিক ও রিকশাচালক বারবার আগের এলাকায় ফিরে যেতে চাইছেন। এটা নিয়েই ছাত্রদের দু’পক্ষে মারামারি হয়েছে। কারা রিকশা গ্যারেজ বসতে দিতে চায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির ছাত্ররা।’

এই মহাজন বলেন, তারা কখনও সরাসরি চাঁদা চায়নি। সব সময় নিজেদের ছেলেদের পড়াশোনার খরচের জন্য চাইত। এখন রাস্তায় অবৈধভাবে বসতে হলে কাউকে না কাউকে তো কিছু দিতে হবে। তারা যদি সেফটি দেয়, তাহলে সমস্যা কোথায়?

অপর এক গ্যারেজ মালিক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হঠাৎ করে রিকশা উচ্ছেদের পর নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করলাম। বিএনপির লোকজন বলল যে নির্বাচনটা যাক, তারপর গ্যারেজ বসাব। কিন্তু এই আসনে বিএনপির প্রার্থী জিততে পারেননি। এখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সুবিধা করতে পারছে না। ঢাকায় তো আমাদের কোনো সহায়-সম্পত্তি নাই। কোথাও নিজের টাকায় গ্যারেজ বসাব, সেই সামর্থ্য নাই। মনে হচ্ছে এই ব্যবসা ধরে বিপদে পড়েছি। স্থানীয় বিএনপি নেতারাও বলছে, প্রয়োজনে ব্যবসা ছেড়ে দাও।

বর্তমানে সচল রয়েছে এমন একটি রিকশা গ্যারেজের মালিক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আগে টাকা-পয়সার বিনিময়ে থাকা যেত। কিন্তু এখন পলিটেকনিকের কিছু ছাত্র এসে উঠে যেতে বলেছে। টাকা-পয়সার কোনো কথা বলেনি। স্যাররাও বারবার এসে উঠে যেতে বলে। হয়ত দ্রুতই আমাদের অন্য দিকে চলে যেতে হবে। তবে ছাত্রদের কারা উঠে যেতে বলেছে, এমন প্রশ্নে তিনি তাদের নাম কিংবা দলীয় পরিচয় জানাতে পারেননি।

এসব গ্যারেজ মালিক, কর্মচারী ও রিকশা শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে শাখা ছাত্রদল সভাপতি সাব্বির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিনের অনুসারীরা জড়িত। এর মধ্যে ছাত্রদল নেতা মেহেদি ও মিলন নামে দুজনের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন তারা।

রিকশা গ্যারেজ মালিকদের হুমকি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি আয়মেন হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা কাউকে হুমকি দেইনি। তবে চলে যেতে বলেছি। কারণ এত রক্তের বিনিময়ে এত কিছু হওয়ার পর নতুন করে এখানে রিকশা গ্যারেজ বসবে, তাদের সঙ্গে মাদকের আখড়া বসবে, সে মাদক আমাদের হলেও চলে আসবে, এটা আমরা মেনে নিতে পারব না।

লতিফ হলের পাশের ল্যাবরেটরি স্কুল মোড়ে বিভিন্ন গ্যারেজ বসেছে

তবে হুমকির বিষয়টি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের কাছে স্বীকার করেছেন পলিটেকনিক শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মিসবাউল ইসলাম রিফাত। তিনি বলেন, রিকশা গ্যারেজ চালু করতে এলে আমাদের ছেলেদের থ্রেটের পর তারা গ্যারেজ চালু করতে পারেনি।

এদিকে ছাত্রশিবির সেক্রেটারির বক্তব্যে মাদকের বিষয়টি নিয়ে রিকশা গ্যারেজ, কর্মচারী ও রিকশা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পুনরায় জানতে চাইলে শিবির সেক্রেটারি বলেন, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা মাদকের ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন কথা আমি বলিনি, তবে তাদের কেউ কেউ হলে মাদক সেবন করে। এ ছাড়া ক্যাম্পাস ও হল এলাকায় রিকশা চালকদের মাদক ও জুয়ার আসর বসানোর কথা বলেছি।

সংঘর্ষের নেতৃত্বে সাবেক ছাত্রলীগ ও বহিষ্কৃতরা
জানা শেষে গেছে, গতকাল সোমবার রাত ১১টার দিকে হল মসজিদ থেকে তারাবির নামাজ শেষে শাখা ছাত্রশিবিরের এইচআরডি সম্পাদক মারুফ বিল্লাহসহ সংগঠনটির কর্মী রাইসুল বারী ও সাইফুল হল ভবনে ফিরছিলেন। তারা ঢাকা পলিটেকনিক ল্যাবরেটরি স্কুল মোড়ে পৌঁছালে একটি টং দোকানে বসে থাকা ছাত্রদল নেতা ও শেষ বর্ষের ছাত্র মেহেদিসহ ৪-৫ জন তাদের সঙ্গে কথা বলতে যান। এ সময় উভয় পক্ষে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।

ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ছাত্রদল নেতা মেহেদি শিবির নেতা মারুফ বিল্লাহকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর তো হলে থাকতি, কেমন লাগছে?’ এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পরে তোরা এখনও হলে থাকিস’। এ সময় মারুফ বিল্লাহর সঙ্গে থাকা রাইসুল বারী তার মুঠোফোনে ঘটনার দৃশ্য ধারণ করতে গেলে তাকে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক পেটান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। পরে সাইফুল হল ভবনে গিয়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের এ ঘটনার বিবরণ দিলে তারা বেরিয়ে মেহেদিসহ ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেন।

সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদল নেতা মেহেদি ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে, বাম পাশে লাল চিহ্নিত

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, এ ঘটনার কিছুক্ষণ পরই রামদা, চাকু ও লোহার স্টিকসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে লতিফ হলে আক্রমণ করেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। এতে বহিরাগত বেশ কয়েকজনও অংশ নেন। শুরুতে ২৫ থেকে শেষ পর্যন্ত ২ শতাধিক লোকজন এ হামলায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন হলটির শিক্ষার্থীরা। তাদের হামলায় ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন আহত হন। সংগঠনটির দাবি, তাদের মোট ১২ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। উভয় পক্ষে সংঘর্ষ শুরু হলে ছাত্রদলেরও একজন আহত হন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদলের কমিটি মাত্র দুই সদস্যের। এর সভাপতি সাব্বির আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিন। উভয়ের কেউই এ সংঘর্ষের সময় উপস্থিত ছিলেন না। তবে এ হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন মেহেদি ও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রদল কর্মী ইকরাম হোসেন মসি। এর মধ্যে মেহেদি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদলে যোগ দিয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া গত বছরের মে মাস জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির (তখনকার বাগছাস) সঙ্গে সংঘর্ষ এবং এক শিক্ষার্থীকে উলঙ্গ করে পেটানো ও গুলি করে মারার হুমকির ঘটনায় পরবর্তীতে ৫ ছাত্রদল কর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করে ইনস্টিটিউট প্রশাসন। এর মধ্যে ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের সচিন এবং ইলেকট্রনিক্স বিভাগের অনিক ও সৈকত এই সংঘর্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রলীগের মিছিলে থাকা অনিক এখন ছাত্রদল নেতাদের প্রটোকল দেন

এদিকে সাবেক ছাত্রলীগ ও বহিষ্কৃতদের নেতৃত্বে লতিফ হলে সংঘর্ষের ঘটনায় ‘সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ’ হওয়ার মতো বক্তব্য দিয়ে বহিষ্কার হয়েছেন শাখা ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার হক শান্ত। মঙ্গলবার তাকে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় সংসদ। এর আগে গতকাল রাতে সংঘর্ষের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনায় ‘ছাত্রদল নামধারী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের’ ওপর দায় দিয়েছিলেন এই নেতা। সংঘর্ষের ঘটনায় প্রকাশিত একটি সংবাদের ফটোকার্ড শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, ‘ছাত্রদল নামধারী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের দায়ভার পলিটেকনিক ছাত্রদল নিবে না।’

এমন ফেসবুক পোস্টের কারণে ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার হককে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় সংসদ

শুধু শাহরিয়ার হক শান্তই নন, ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতা এ ঘটনায় ছাত্রলীগ থেকে আসা নেতাকর্মীদের দিকে আঙুল তুলেছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাবেক পাঠাগার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও ঢাকা পলিটেকনিকের শিক্ষার্থী মেহেরাব হাসান তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘ঢাকা পলিটেকনিকের লতিফ ছাত্রাবাসে যারা আজকে এই মারামারি করেছে, তাদের বেশির ভাগই ৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিল।’

তিনি লিখেছেন, ‘অযথা ছাত্রদলের নাম খারাপ করবেন না। ঢাকা পলিটেকনিকে এখনো খুনী হাসিনার রেখে যাওয়া কিছু কুকুররূপী সন্ত্রাসী বিভিন্ন অপকর্ম করছে।’

নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধারে শিবিরের চিঠি, উদাসীন প্রশাসন
সোমবার রাতের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তবে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে লতিফ হলসহ ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তিন হলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অধ্যক্ষকে চিঠি দেয় শাখা ছাত্রশিবির। কিন্তু পলিটেকনিক প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। খোদ অধ্যক্ষের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি মিসবাউল ইসলাম রিফাত দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নির্বাচনের আগে হল থেকে অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তারা কখনও সরাসরি চাঁদা চায়নি। সব সময় নিজেদের ছেলেদের পড়াশোনার খরচের জন্য চাইত। এখন রাস্তায় অবৈধভাবে বসতে হলে কাউকে না কাউকে তো কিছু দিতে হবে। তারা যদি সেফটি দেয়, তাহলে সমস্যা কোথায়?— গ্যারেজ মালিক

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে মঙ্গলবার ও বুধবার ঢাকা পলিটেকনিক ক্যাম্পাসে সরেজমিন গেলে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সাব্বির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিনকে পাওয়া যায়নি। তাদের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে বেশ কয়েকবার কল দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির পলিটেকনিকের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নাছির বলেন, রিকশা গ্যারেজ এবং চাঁদা সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।

তবে ছাত্রশিবির ঢাকা পলিটেকনিকের হল দখলে বেশ মরিয়া বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান আর কোনো ক্যাম্পাসে গিয়েছেন কিনা জানি না, কিন্তু পলিটেকনিকে তারা বেশ কয়েকবার গিয়েছেন। ওখানে তাদের লোক তেমন নাই, এজন্য বারবার হলটা দখলের চেষ্টা করছে।

পুলিশের কাছেও রিকশা গ্যারেজ ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন ডিএমপির তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান। জানতে চাইলে চাঁদাবাজির বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মো. হাবিবুর রহমান। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সংঘর্ষের বিষয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।