নিজ ক্যাম্পাস স্ট্যানফোর্ডে সমাবর্তন বক্তা পিচাইয়ের ৩ তত্ত্ব: ওয়ার্কিং অন হার্ড থিং, চুজ অপটিমিজম ও ডু থিংস দ্যাট এক্সাইটস ইউ
নিজের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ২০২৬ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে এক অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিয়েছেন গুগল ও অ্যালফাবেটের সিইও সুন্দর পিচাই। মহামারি উত্তর সময়ে সশরীরে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সামনে এটি তাঁর দ্বিতীয় সমাবর্তন ভাষণ। এই বিশেষ মুহূর্তে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জটিল প্রযুক্তির মারপ্যাঁচ বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের দিয়েছেন জীবন গড়ার ৩টি তত্ত্ব।
বক্তব্যের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে পিচাই বলেন, ‘জীবন মানে বড় বড় মুহূর্তের সমষ্টি এবং প্রতিটিতেই নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ—মেধাবীদের এই ভাবনা ভুল। সাময়িক গ্রেড, পরীক্ষা বা প্রথম চাকরি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর প্রভাব আপনাদের ভাবনার চেয়ে অনেক কম।’
নিজের জীবনের প্রথম ক্লাস ফাঁকি দিয়ে লাস ভেগাস ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করে তিনি মনে করিয়ে দেন, একটু রিল্যাক্স করলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায় না।
তরুণদের ক্যারিয়ার ও জীবনের চাপ কমাতে নিজের জীবন থেকে নেওয়া যে ৩টি তত্ত্ব তিনি দিয়েছেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো,
১. ‘চুজ অপটিমিজম’ বা আশাবাদকে বেছে নেওয়া
বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ-বিগ্রহ, অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে সুন্দর পিচাইয়ের প্রথম তত্ত্ব হলো—পরিস্থিতি যেমনই হোক, দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক রাখা। তিনি নিজের শৈশবের চেন্নাই শহরের তীব্র খরা ও প্রযুক্তির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার কথা মনে করিয়ে দেন।
ক্যালিফোর্নিয়ায় আসার পর হাইওয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় চারপাশের শুষ্ক বাদামী প্রকৃতি দেখে তাঁর হোস্ট মিসেস জেন আর্ল বলেছিলেন, “আমরা একে ‘গোল্ডেন’ বা সোনালী বলতে পছন্দ করি।” দৃষ্টিভঙ্গির এই সামান্য পরিবর্তনই পিচাইয়ের জীবন বদলে দেয়। স্ট্যানফোর্ডে পিএইচডি ছেড়ে যখন আর্থিক প্রয়োজনে মাস্টার্স নিয়ে বের হতে হয়েছিল, তখন এই আশাবাদই তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। পিচাইয়ের মতে, আমরা কোন পৃথিবীতে গ্র্যাজুয়েশন করছি তা আমাদের হাতে নেই, কিন্তু পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখব— সেই ফ্রেমটি বেছে নেওয়ার সুযোগ আমাদের আছে।
২. ‘ওয়ার্কিং অন হার্ড থিং’ বা কঠিন কাজের দিকে ঝুঁকুন
সুন্দর পিচাইয়ের দ্বিতীয় জীবনদর্শন হলো—সহজ পথের খোঁজ না করে কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং কাজের দায়িত্ব নেওয়া। ২০০৪ সালের ১লা এপ্রিল (এপ্রিল ফুল ডে) গুগলে জিমেইল চালুর দিনে ইন্টারভিউ দেওয়া পিচাই কর্মজীবনের শুরুতে মোটেও খুব দ্রুত সফল হননি। কিন্তু গুগলে আসার পর মাত্র ১০ জনের দল নিয়ে ব্রাউজার (ক্রোম) তৈরির মতো অসম্ভব কঠিন কাজ হাতে নেন।
শুরুর দিকে মাইক্রোসফটের সিইও যখন ক্রোমকে ঠাট্টা করে ‘নগণ্য ভুল’ বলেছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার আশাবাদ দিয়ে পিচাই তাঁর টিমকে বুঝিয়েছিলেন যে, তারা সঠিক পথেই আছেন। পিচাই বলেন, ‘কঠিন কাজ সবসময় আপনার চারপাশে অন্য সব প্রতিভাবান ও আশাবাদী মানুষকে আকর্ষণ করে। আর বড় লক্ষ্যটি পুরোপুরি পূরণ না হলেও, আপনি অবধারিতভাবে দারুণ কিছু একটা শিখে ফেলবেন।’
৩. ‘ডু দি থিংস দ্যাট এক্সাইটস ইউ’ বা যা রোমাঞ্চ জাগায় তা-ই করা
পিচাইয়ের শেষ তত্ত্বটি অত্যন্ত সরল। যখন চারপাশের সবকিছু সমান মনে হবে, তখন সেই কাজটিই করুন যা আপনাকে ভেতর থেকে রোমাঞ্চিত বা এক্সাইটেড করে। ১৯৯৩ সালে স্ট্যানফোর্ডের সুইটহলে সারিবদ্ধ কম্পিউটার দেখে প্রযুক্তির যে রোমাঞ্চ তিনি অনুভব করেছিলেন, তা-ই তাঁকে গুগলে টেনে এনেছিল। পরবর্তীতে অ্যান্ড্রয়েড ও ক্রোমবুকের মতো প্রজেক্টে কাজ করার মূল তাড়নাও ছিল এই রোমাঞ্চ।
ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামের নারীদের অ্যান্ড্রয়েড ফোন দিয়ে জীবন বদলাতে দেখা বা মার্কিন ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির মাধ্যমে শিখতে দেখার আনন্দই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বাবা-মা কী চান, বন্ধুরা কী করছে বা সমাজ কী আশা করে, তা নিয়ে ভাববেন না। বরং কোন বিষয়টি নিয়ে আপনি আপনার রুমমেটের সাথে গভীর রাত পর্যন্ত উত্তেজিত হয়ে আড্ডা দিতে পারেন, ঠিক সেই কাজটিই করতে নেমে পড়ুন।’
‘ভেতরের আগুনকে জ্বালিয়ে দাও’
বক্তব্যের শেষে ২০২৬ সালের গ্র্যাজুয়েট ব্যাচকে ইতিহাসের সবচেয়ে সক্ষম ব্যাচ হিসেবে আখ্যায়িত করেন সুন্দর পিচাই। জীবনের হাজারো মুহূর্তে সব সিদ্ধান্ত সঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কখনো আমরা বরফে ঢাকা পাহাড়ে পৌঁছাব, আবার কখনো হয়তো লাস ভেগাসের গোলকধাঁধায়— দুটোই জীবনের উপহার। স্ট্যানফোর্ডের গ্র্যাজুয়েটদের বিদায়লগ্নে ক্যালিফোর্নিয়ার সোনালী আভা বুকে নিয়ে নিজের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার বাইরে বের হও। তোমাদের ভেতরের আগুনকে জ্বালিয়ে দাও।’