১২ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৪৩

বিতর্কিত ব্যক্তিকে চট্টগ্রাম বিসিএসআইআরের পরিচালক নিয়োগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদেশ বাতিল

ড. মো. আব্দুস সালাম  © সংগৃহীত

নানা অনিয়মে বিতর্কিত ও আওয়ামী লীগ (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সাবেক বিজ্ঞানমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের ঘনিষ্ঠ ড. মো. আব্দুস সালামকে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) চট্টগ্রাম গবেষণাগারের পরিচালক নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। দ্বিতীয় গ্রেডের এই পদে নিয়োগও হয়েছিল প্রথম শ্রেণির পদে চাকরি অভিজ্ঞতার শর্ত লঙ্ঘন করে। তবে বিতর্কের মধ্যে নিয়োগের ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই তার নিয়োগ আদেশ বাতিল করা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ড. আব্দুস সালাম বর্তমানে বিসিএসআইআরের প্রতিষ্ঠান জয়পুরহাটের ইন্সটিটিউট অব মাইনিং, মিনারেলজি অ্যান্ড মেটালার্জির (আইএমএমএম) সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। গতকাল মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিসিএসআইআরের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে এক প্রজ্ঞাপনে তাকে চট্টগ্রামের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এতে সই করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ শহিদুল হক পাটওয়ারী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের একটি সুপারিশের ভিত্তিতে ড. আব্দুস সালামকে এই নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ নিয়ে আজ বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে বিসিএসআইআর চেয়ারম্যান ড. সামিনা আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিসিএসআইআর বিজ্ঞানী সংঘ। সংঘের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ রায় রনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, বৈঠককালে এই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে বলে তাদের জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে ড. সামিনা আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে বুধবার বিসিএসআইআর সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক পাটওয়ারী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ড. মোহাম্মদ আব্দুস সালামকে আইএমএমএমে ‘সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার’ মূল পদে রেখে চট্টগ্রামে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে।

সাধারণ কলেজে পড়েও ইঞ্জিনিয়ার
ড. আব্দুস সালাম বহু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার না হয়েও ইঞ্জিনিয়ার পরিচয়, ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার পদ বাগিয়ে নেওয়া, প্রেষণে পিএইচডি করতে দেশের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত দুই মাস অনুপস্থিতিসহ নানা কারণে বিতর্ক তার পিছু ছাড়েনি। অনুপস্থিতির কারণে শাস্তির মুখোমুখিও হয়েছিলেন তিনি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিসিএসআইআর ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ মন্ত্রণালয়াধীন সব কটি প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন সাবেক মন্ত্রী ইয়াফেসের ছত্রছায়ায় তার পুত্র পরিচয় দেওয়া নাজিম জামান। তিনি নিজেও আইএমএমএমের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। এর মধ্যে বিসিআইআরে হাইড্রোজেন এনার্জি নামক একটি প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছিলেন ড. আব্দুস সালাম। মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে আব্দুস সালামসহ অন্যান্যরা বারবার উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সিন্ডিকেটের গড়ে লুটপাট করেছেন—এমন অভিযোগে তাদের সকল অনিয়ম তদন্তের দাবি উঠেছে অনেকবার।

২০২০ সালে বিসিএসআইআরের নিয়োগ, কেনাকাটা ও ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ তার চার বছরের দায়িত্ব পালনকালে এসব অনিয়ম করেছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা দেন। ওই অভিযোগে আব্দুস সালামের নিয়োগ নিয়েও আপত্তি ছিল।

দুদকে জমা হওয়া অভিযোগে বলা হয়, সায়েন্স ল্যাব থেকে বিদায় নেওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে ফারুক আহমেদ চট্টগ্রামের একটি কলেজ থেকে পাস করা ও মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করা আব্দুস সালামকে নিয়োগ দেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী কেমিক্যাল প্লান্ট ডিজাইনে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও সালামকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার (গ্রেড-৩) পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ তিনি সায়েন্স ল্যাবের অন্তত ১৫০ জন বিজ্ঞানীর জুনিয়র। এতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

ওই সময় তৎকালীন বিসিএসআরআই চেয়ারম্যানকে দেওয়া এক অভিযোগপত্রে বিজ্ঞানী সংঘ (সায়েন্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন) তার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানায়। অভিযোগে বলা হয়, ড. আব্দুস সালাম ১৯৯৩ সালে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ২০১০ সালে তিনি ‘প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার’ পদে পদোন্নতি পান। এরপর ২০১৯ সালের ২৫১তম পরিষদ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ১(ক) অনুযায়ী তাকে ‘সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার’ পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। তবে বিসিএসআইআর এর চাকুরী প্রবিধানমালা অনুযায়ী ‘সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার’ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রীর কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবুও তাকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি দেখিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়। যদিও তিনি ওই সময় পর্যন্ত তার পিএইচডি সনদ দেখাতে সক্ষম হননি।

এ ছাড়া তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি বা এমএসসি ডিগ্রিধারী নন, তিনি পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রীধারী। ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান করা বিসিএসআইআর প্রবিধানমালার পরিপন্থী।

অনুমতি ছাড়া বিদেশে থাকায় শাস্তি
এদিকে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর বিজ্ঞানী সংঘের এক জরুরি বর্ধিত সভায় ড. আবদুস সালামের প্রেষণ, শিক্ষা ছুটি, পিএইচডি অর্জন ও পরবর্তী নিয়োগ সংক্রান্ত একাধিক অনিয়ম নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য চেয়ারম্যানের কাছে উপস্থাপন করা হয়। এগুলৈা হলো— ড. মো. আবদুস সালাম মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি পেট্রোনাস থেকে পিএইচডি করার জন্য ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা পাঁচবার এক বছরের প্রেষণ ছুটি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ থেকে ১ অক্টোবর ২০১৬ পর্যন্ত তিনি অনুমোদনবিহীনভাবে বিদেশে অবস্থান করেন, যার সময় ৭ মাস ৮ দিন।

এ ঘটনায় অননুমোদিত বিদেশ অবস্থানের জন্য তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা গঠিত হয় এবং ব্যক্তিগত শুনানির পর ২৮৭তম বোর্ড সভায় তাকে রিসার্চ কেমিস্ট পরিষদে যোগদানের পর থেকে ৬ বছর নিরবিচ্ছিন্নভাবে চাকরি করার শর্তে তার যোগদানপত্র গৃহীত হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া অননুমোদিতভাবে ৭ মাস ৮ দিন বিদেশে অবস্থানকাল বিনা-বেতনে অসাধারণ ছুটি হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়।

এরপর ১ অক্টোবর তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেন। কিন্তু মাত্র ৩ বছর ৯ মাস পর ২০২০ সালের ২৯ জুন তিনি জয়পুরহাট আইএমএমএমে সৃজিত সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার (৩য় গ্রেড) পদে নতুনভাবে যোগদান করেন, যা স্পষ্টতই বোর্ডের নির্ধারিত ৬ বছরের শর্ত পূরণ করেনি। ফলে বোর্ডের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘিত হয়েছে।

ওই অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ড. আবদুস সালামের জমাকৃত পিএইচডি সার্টিফিকেট অনুযায়ী পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের তারিখ ১৯ অক্টোবর ২০১৫। অথচ তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ থেকে ১ অক্টোবর ২০১৬ পর্যন্ত টানা প্রেষণ ও ছুটিতে ছিলেন। আইএমএমের নিয়োগের আবেদনে জানা গেছে যে, তিনি পিএইচডি সম্পন্নের পূর্বে ওই সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি পেট্রোনাসে প্রভাষক পদে চাকরি করেছেন, যা পরিষদের বা সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া সম্পূর্ণ অবৈধ ও সরকারি চাকরিবিধির পরিপন্থী। এটি পরিষদের প্রশাসনিক বিধি অনুসারে ‘অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণ’-এর সরাসরি লঙ্ঘন।

ড. আব্দুস সালামের পরিচালক পদে আবেদন প্রসঙ্গে ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, সরকারি বিধান (জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫) অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা ২য় গ্রেড বা তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য হতে হলে প্রথম শ্রেণির পদে ন্যূনতম ১৭ বছরের চাকরিকাল সম্পন্ন করা আবশ্যক। কিন্তু ড. মো. আবদুস সালাম ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ৯ম গ্রেডে যোগদান করেন। অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত তার চাকরিকাল প্রায় ১০ বছর ৯ মাস, অর্থাৎ ১৭ বছর পূর্ণ হয়নি। সুতরাং তিনি বিসিএসআইআরের পরিচালক পদে আবেদন বা পদোন্নতির জন্য অযোগ্য।