০২ মে ২০২৬, ১১:২১

প্লুটোকে গ্রহের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান নাসা প্রধান আইজ্যাকম্যানের

প্লুটো ও নাসা প্রধান   © টিডিসি ফটো

সৌরজগতের এক সময়ের নবম গ্রহ প্লুটোকে পুনরায় গ্রহের তালিকায় ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন নাসা প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান। এই দাবির মাধ্যমে তিনি প্রায় দুই দশক পুরোনো এক অমীমাংসিত বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছেন। 

২০০৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন কর্তৃক প্লুটোর গ্রহের মর্যাদা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে নাসা বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র ও তথ্য-প্রমাণ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। নাসা প্রধানের এমন অবস্থানে মহাকাশ বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন প্লুটোকে ২০০৬ সালে পূর্ণাঙ্গ গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ‘বামন গ্রহ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। মূলত একটি মহাজাগতিক বস্তু ‘গ্রহ’ হতে হলে যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়, আইএইউ-এর সেই নতুন সংজ্ঞার কারণেই প্লুটো তার মর্যাদা হারায়। 

শর্ত তিনটি হলো— 

  • প্রথমত, বস্তুটিকে অবশ্যই সূর্যের চারদিকে ঘুরতে হবে
  • দ্বিতীয়ত, এর যথেষ্ট ভর থাকতে হবে যাতে মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে এটি গোলাকার রূপ পায় 
  • তৃতীয়ত, বস্তুটিকে অবশ্যই তার কক্ষপথের চারপাশ থেকে অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ বা মহাজাগতিক বস্তু পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। প্লুটো প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করলেও তৃতীয় শর্তটি পালনে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই তখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

স্পেস ডট কমের তথ্য অনুযায়ী, দূরবর্তী ‘কুইপার বেল্ট’ অঞ্চলে প্লুটোর কক্ষপথে আরও অনেক বামন গ্রহ ও মহাজাগতিক বস্তুর উপস্থিতি রয়েছে। ফলে সে তার কক্ষপথ পুরোপুরি পরিষ্কার করতে পারেনি এবং একেই তার পূর্ণাঙ্গ গ্রহের মর্যাদা বিচ্যুত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়। 

তবে এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন অনেক বিজ্ঞানী। তাদের যুক্তি হলো— এই মাপকাঠিটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। সমালোচকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন পৃথিবী এবং বৃহস্পতির কক্ষপথেও প্রচুর গ্রহাণু ও মহাজাগতিক বস্তু রয়েছে। কিন্তু তাদের গ্রহের মর্যাদা নিয়ে কখনোই কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না।

ইউরো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে নাসার ‘নিউ হরাইজনস’ মহাকাশযান যখন প্রথমবারের মতো প্লুটোর খুব কাছ থেকে ছবি পাঠায়, তখন থেকেই বিতর্কের নতুন মোড় শুরু হয়। এই ছবিতে দেখা যায়, প্লুটো অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্র্যময় এক জগৎ। সেখানে বিশাল পাহাড়, নাইট্রোজেন-বরফের হিমবাহ এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় পৃষ্ঠ রয়েছে। নিউ হরাইজনসের এই আবিষ্কার প্লুটো সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আগের সব সাধারণ ও সেকেলে ধারণা পুরোপুরি বদলে দেয়।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান তাদের প্রতিবেদনে জানায়, নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান সম্প্রতি সিনেটের এক শুনানিতে অংশ নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি সরাসরি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে প্লুটোকে পুনরায় গ্রহ বানানোর পক্ষে।’

তিনি আরও জানিয়েছেন, নাসা বর্তমানে এই বিষয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও তথ্য গুছিয়ে আনছে। এই গবেষণাপত্রগুলো আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরা হবে যাতে পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে প্লুটোর মর্যাদা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।

তবে প্লুটোকে গ্রহের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার পথে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অরবিটাল টুডের মতে, কিছু গবেষক সতর্ক করে দিয়েছেন প্লুটোকে পুনরায় মর্যাদা দিলে নতুন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারণ সৌরজগতের বাইরের অংশে প্লুটোর মতো আকার ও বৈশিষ্ট্যের আরও প্রায় ১০০টি বস্তু থাকতে পারে। যদি প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে সৌরজগতের গ্রহের তালিকায় আরও অনেক নতুন নাম যুক্ত করতে হতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত মহাজাগতিক বস্তুর নামকরণ এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়নের হাতেই ন্যস্ত।