২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

শিক্ষক সংকটে ব্যাহত পাঠদান, পিছিয়ে পড়ছে গলাচিপার চরাঞ্চলের শিশুরা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষ  © সংগৃহীত

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় বছরের পর বছর শিক্ষক নিয়োগ হলেও কাটছে না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট। বিশেষ করে দুর্গম চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নের বিদ্যালয়গুলোতে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কোথাও এক-দুজন শিক্ষককে সামলাতে হচ্ছে একাধিক শ্রেণির পাঠদান, আবার কোথাও প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিতে হচ্ছে ক্লাস। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে হাজারো শিশু।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে তাদের ধরে রাখা যাচ্ছে না। যোগদানের কয়েক বছর কিংবা তার আগেই বদলি ও অবসরের কারণে আবারও শূন্য হয়ে পড়ছে শিক্ষক পদ। ফলে নতুন নিয়োগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না, আর বছরের পর বছর একই সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গলাচিপা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৯৬টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৯৬টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১২০ জন। শূন্য রয়েছে ৬৫টি পদ এবং মামলা-সংক্রান্ত কারণে সংরক্ষিত রয়েছে ১০টি পদ। এসব বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১ হাজার ১২টি। এর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৮৯৩ জন, আর শূন্য রয়েছে ১১৯টি পদ। কর্মরত ৫৫ জন সহকারী শিক্ষক চলতি দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া প্রায় আটটি বিদ্যালয়ে মাত্র দুই-তিনজন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান।

চর কাজল-চর বিশ্বাসে অর্ধেকের বেশি পদ শূন্য
উপজেলার বিচ্ছিন্ন চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নের শিক্ষক সংকট আরও প্রকট। এই দুই ইউনিয়নের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১২৮টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৫৯ জন। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৬৯টি পদ, যা অনুমোদিত পদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। এই ২৫টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৫ হাজার ৫১১ জন। সে হিসাবে কর্মরত প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৯৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বাস্তবে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একই সময়ে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে হচ্ছে। এতে পাঠ বুঝিয়ে দেওয়া, শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন এবং পিছিয়ে পড়া শিশুদের বাড়তি সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে গলাচিপা উপজেলায় ৩৮ জন শিক্ষক নিয়োগ পান। তাদের মধ্যে চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নে যোগ দেন ৯ জন। ২০২৪ সালে নিয়োগ পাওয়া ৪৭ জনের মধ্যে এই দুই ইউনিয়নে যোগ দেন আরও ছয়জন। দুই বছরে এই দুই ইউনিয়নে নতুন করে যোগদান করেন মোট ১৫ জন শিক্ষক। কিন্তু তাঁদের মধ্যে তিনজন চাকরি ছেড়ে দেন। একই সময়ে অবসরে যান আরও নয়জন শিক্ষক। ফলে নতুন নিয়োগের পরও শিক্ষকসংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

চলতি বছরের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গলাচিপা উপজেলায় ৪৫ জন শিক্ষক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৫ জনকে চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। কিন্তু এই দুই ইউনিয়নেই যেখানে শূন্য পদ ৬৯টি, সেখানে নতুন সুপারিশপ্রাপ্ত সবাই যোগদান করলেও সংকট পুরোপুরি কাটবে না। এর বাইরে উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের বিদ্যালয়েও রয়েছে শূন্য পদ।

এর সঙ্গে বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে ১৭ জন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে এবং পাঁচজন শিক্ষক অবসরের কাছাকাছি রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব বদলি ও অবসর কার্যকর হলে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্য চর কাজল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান মিলন বলেন, ‘একটি শ্রেণিকক্ষে তিনটি ক্লাস একসঙ্গে নিতে হয়। ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষক দিয়ে মানসম্মত পাঠদান করা সম্ভব নয়। তারপরও দায়িত্ব পালন করছি।’

দক্ষিণ চর বিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পারভেজ হাসান বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় একাই তিনটি শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়। পাশের উপজেলায় দুর্গম ভাতা আছে, আমাদের নেই। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এভাবে ক্লাস নেওয়া খুবই কঠিন।’

শিক্ষকদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তাঁদের ওপর পাঠদানের বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে একাধিক শ্রেণি সামলাতে গিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সময় দেওয়া এবং পাঠে পিছিয়ে পড়াদের ঘাটতি পূরণের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

শিক্ষকসংকটের প্রভাব পড়ছে শিশুদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ওপর। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় সন্তানদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পেরে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবকেরা।

অভিভাবক আছমা আক্তার বলেন, ‘পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় আমাদের সন্তানরা ঠিকমতো পড়তে পারছে না। শুধু শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক শিশু পড়াশোনায় পিছিয়ে যাচ্ছে।’

আরেক অভিভাবক আনিস হোসেন বলেন, ‘অন্য এলাকা থেকে আসা শিক্ষকরা চরে দুই-তিন বছর থেকে বদলি হয়ে চলে যান। তাই স্থানীয়দের বিশেষ নিয়োগ না দিলে এই সংকট কখনো শেষ হবে না।’

স্থানীয়দের মতে, দুর্গম এলাকায় শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাদের কর্মস্থলে ধরে রাখার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শুধু নিয়োগ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না; শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, আবাসন এবং দুর্গম এলাকার জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মজনু মোল্লা বলেন, ‘এটি একটি রিমোট এলাকা। এখানকার বেশিরভাগ শিক্ষক নদী পেরিয়ে আসেন। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও সীমিত। বিধিমালায় সুযোগ না থাকলেও স্থানীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া গেলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে যেত।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, ‘গলাচিপা উপজেলার বিচ্ছিন্ন দুটি ইউনিয়ন—চর কাজল ও চর বিশ্বাস দুর্গম চরাঞ্চল। এসব এলাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, কিন্তু শিক্ষকসংখ্যা কম। তাই ২০২৬ সালের শিক্ষক নিয়োগে এই দুই ইউনিয়নের শিক্ষকসংকট বিবেচনায় নিয়ে শূন্য পদগুলোতে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষক পদায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে যেসব বিদ্যালয় চলছে, সেসব বিদ্যালয়ে পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদায়নের জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে।’

চর কাজল ও চর বিশ্বাসের বাসিন্দাদের দাবি, দুর্গম এলাকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি, শিক্ষকদের জন্য দুর্গম ভাতা চালু, আবাসন নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পদায়নের নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। তাঁদের মতে, দ্রুত শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় শিক্ষক ধরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে হলে প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ যেন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সংকুচিত না হয়, সে জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। অন্যথায় নিয়োগের পরও শিক্ষকসংকটের এই চক্র চলতেই থাকবে, আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে চরাঞ্চলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।