ক্লাস শেষে স্কুলবাসের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল শিশুটি, সেই বাসের চাপায়ই গেল প্রাণ
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি শাখার বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার শায়নের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার সময় একটি স্কুলবাসের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল শিশুটি। বাসটি পেছনের দিকে চলতে শুরু করলে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পরিবার, সহপাঠী ও শিক্ষকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত শাহরিয়ার শায়ন ঢাকার খিলক্ষেতের বটতলা এলাকার বাসিন্দা সাজু আহমেদের ছেলে। সে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি শাখার দ্বিতীয় শ্রেণির ‘সি’ শাখার শিক্ষার্থী ছিল। তার বয়স ছিল আট বছর।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জলসিঁড়ি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়।
ওসি আরও বলেন, এ ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি।
এদিকে বুধবার (১৪ অক্টোবর) অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান সামি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে দুর্ঘটনার সময়, শিশুটির মরদেহ পড়ে থাকা এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন। তার পোস্টটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো—
গতকাল (১৩ অক্টোবর) দুপুর ৩টা থেকে ৩টা ১৫ মিনিটের মধ্যে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি ক্যাম্পাসের ভেতরে স্কুলবাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার শায়ন। একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শায়ন একটি স্কুলবাসের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। বাসটি হঠাৎ রিভার্স করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে।
কিছুক্ষণ আগে শায়নের বাবাকে ফোন করলে তিনি জানান, সন্তানের লাশ দাফনের জন্য পাবনা নিয়ে যাচ্ছেন। শোক সামলে তিনি বলেন, বিকেল আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটে স্কুল থেকে ফোন করে তাকে যেতে বলা হয়। প্রায় ৪টা ৩০ মিনিটে পৌঁছালে তাকে জানানো হয়, দুর্ঘটনায় তার সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। তখনও পর্যন্ত শিশুটির লাশ ওই বাসের নিচেই পড়ে ছিল। হাতে আসা বিভিন্ন ছবি যাচাই করে দেখা গেছে, কাগজের কার্টন জাতীয় কিছু দিয়ে লাশ ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—স্কুলের ভেতর একটা শিশু দূর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার পর কেন কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে শিশুটিকে হাসপাতালে নেয়নি? কেন তাঁর লাশ বাসের নিচে পড়ে থাকলো?
শায়নের বাবা আরও জানান, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ছেলের লাশ তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে রূপগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ময়নাতদন্তের প্রসঙ্গ তুললে তিনি রাজি হননি। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক এই পিতা কোনো মামলাও করেননি; ময়নাতদন্ত করবেন না—এই মুচলেকা দিয়ে সন্তানের লাশ নিয়ে যান।যে অভিভাবক সকালে জলজ্যান্ত সন্তানকে স্কুলে পাঠালেন, সেই স্কুল ক্যাম্পাসের ভেতরেই বাসের চাকায় তার মৃত্যু—তারপর হাসপাতালের বদলে মৃতদেহ পড়ে থাকল বাসের নিচে, আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে সেই লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হলো। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের নয়।
‘কয়েকটি দৈনিকের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: ‘স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে বাসে ওঠার সময় পা পিছলে নিচে পড়ে যায় শায়ন। এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।’ এটা কি খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা? ঘটনাস্থল স্কুল ক্যাম্পাসের ভেতরে, যেখানে চলন্ত বাসে কোনো শিশুর ওঠার সুযোগই নেই। আর যদি পড়েও যায়, তাহলে বাসের গতি কত ছিল? এই ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। সামরিক বাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বলে তদন্ত ও মামলা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
স্ট্যাটাসের শেষে তিনি লেখেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি পরামর্শ—বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখুন। বাসচালক কিংবা অন্য কারও অবহেলা থাকলে তাদের শনাক্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন।
শিশু শিক্ষার্থী শাহরিয়ার শায়নের মৃত্যুতে শোকবার্তা দিয়েছে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি শাখা। শোকবার্তায় প্রতিষ্ঠানটি জানায়, দ্বিতীয় শ্রেণির ‘সি’ শাখার অত্যন্ত মেধাবী ও আদরের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার শায়ন (৮) ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ বিকেল ৩টা ৩২ মিনিটে এক আকস্মিক ও মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
শোকবার্তায় আরও বলা হয়, শিক্ষার্থীর অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জলসিঁড়ি পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। শায়নের মতো নিষ্পাপ শিশুর এভাবে চলে যাওয়া সবার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রতিষ্ঠানটি শায়নের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে। একই সঙ্গে মহান আল্লাহর দরবারে তার জন্য জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্থান প্রার্থনা করেছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করে শোকবার্তায় বলা হয়, আল্লাহ তায়ালা যেন তার বাবা-মা ও স্বজনদের এই চরম শোক সহ্য করার ধৈর্য ও শক্তি দান করেন। আমিন।
শাহরিয়ার শায়ন, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জলসিঁড়ি, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, স্কুলবাস দুর্ঘটনা, শিক্ষার্থী নিহত, জুলকারনাইন সায়ের খান সামি