০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১:১৭

‘হাত নেই, পা দিয়ে ধর্মীয় বই ধরা যাবে না’—মাদ্রাসায় ভর্তি না নেওয়া দুখু এখন মানুষ গড়েন

পা দিয়ে লিখে ক্লাস নিচ্ছেন দুখু মিয়া  © সংগৃহীত

পৃথিবীতে পা রেখেছিলেন দুই হাত ছাড়া। তার জন্মের পরপরই মারা গেছে বড় তিন ভাই। দুঃখ মিশিয়ে দাদা তার নাম রেখেছিলেন দুখু মিয়া। স্নাতক (ডিগ্রি) পাস করার পরও কোথাও চাকরি হয়নি। সেই দুখু ‍মিয়ার পৈতৃক ভিটায় গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানে এখন চাকরি করছেন ৯ জন শিক্ষক। আছেন আরও দুজন কর্মচারী। অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে ২০ বছর ধরে চলে আসা এই প্রতিষ্ঠান এখন অসংখ্য শিশুর জীবন গড়ার কারিগর।

গল্পটি নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা ইউনিয়নের নগর এলাকার আলতাফ হোসেনের। বর্তমানে তার ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেনে’ ১৪৫ শিশু পড়াশোনা করছে।

দুখু মিয়া জন্মেছিলেন ১৯৬২ সালে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্ম হলেও পরিবার দুখু মিয়ার পড়াশোনা বন্ধ করেনি। পাঁচদোনা ইউনিয়নের দিঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয় তার পড়াশোনা। হাত না থাকায় ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন বাবা তমিজ উদ্দিন।

দুখু মিয়া জানান, পাতিলের কালি ও পানি মিশিয়ে কঞ্চি দিয়ে কলাপাতায় দুই পায়ের আঙুলের ফাঁকে ধরে ধরে অক্ষর শেখাতেন বাব। এরপর পা দিয়ে লিখেই তিনি পার করেন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক (ডিগ্রি)। ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক, ১৯৮৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন তিনি।

এর আগে ছোটবেলায় বাবা তাকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুই হাত না থাকায় পা দিয়ে ধর্মীয় গ্রন্থ স্পর্শ করতে হবে—এই অজুহাতে তাকে ভর্তি নেওয়া হয়নি।

এদিকে শিক্ষাজীবন শেষে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ভাইভায় গিয়ে বারবার বাদ পড়তে থাকেন। চাকরির আশায় বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তার দ্বারে ঘুরেও মেলেনি কোনো সুরাহা। দুখু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, আবেদন করার পর কেউ আমাকে চাকরি দেয়নি। ভাইভায় গিয়ে বারবার আটকে গেছি। কোনো কর্মকর্তা বা মন্ত্রী আমার দিকে হাত বাড়াননি।

চরম হতাশার মধ্যেও থেমে যাননি দুখু মিয়া। টিউশনি ও কোচিং করে জমানো টাকা এবং পরবর্তীতে বাবার দেওয়া জমি বিক্রি করে ২০০৭ সালে পৈতৃক ভিটায় টিনশেড ভবনে গড়ে তোলেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয় প্রতিষ্ঠানটিতে। বিশেষ সুবিধা হিসেবে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ।

তবে সীমিত সাধ্যের মধ্যে নানা টানাটানির মধ্য দিয়েই স্কুলটি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মাঝেমধ্যে শিক্ষকদের ঠিকমতো সম্মানি দিতে পারেন না, তবুও শিক্ষকেরা সহানুভূতিশীল হয়ে প্রতিষ্ঠানটির পাশে রয়েছেন। ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টিকে একটি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই মূল পরিচালনার দায়িত্ব সামলাবেন।

দুঃখু মিয়া বলেন, আমি এলাকার শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যেতে চাই। আরও চাই, কোনো প্রতিবন্ধী শিশু যেন আমার মতো অবহেলা ও হেয় প্রতিপন্ন না হয়। সেই তাগিদ থেকেই এ উদ্যোগ।

তবে এত দিন ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা করলেও সরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে তার। দুখু মিয়া বলেন, এত সংগ্রাম করার পরও আজ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য বা স্বীকৃতি পাইনি, স্কুলের জন্যও কোনো অনুদান মেলেনি।